
পবিত্র কোরআনের ১০৮তম সুরা কাওসার। মাত্র তিন আয়াতের এ ছোট সুরায় মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অফুরন্ত কল্যাণের সুসংবাদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের পরিণতির কথাও ঘোষণা করেছেন। এতে রয়েছে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, একনিষ্ঠ ইবাদত এবং নবীজির মর্যাদা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
সুরা কাওসারের শানে নুজুল
সুরা কাওসার অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে কয়েকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুত্রসন্তানদের শৈশবে ইন্তেকালকে কেন্দ্র করে মক্কার মুশরিকরা তাঁকে উপহাস করত। তারা তাঁকে ‘আবতার’ বলে কটূক্তি করত। আরবি ‘আবতার’ শব্দের অর্থ নির্বংশ বা যার বংশধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুত্র কাসেমের ইন্তেকালের পর আস ইবনে ওয়ায়েল তাঁকে নির্বংশ বলে বিদ্রূপ করে। তাদের ধারণা ছিল, পুত্রসন্তান না থাকায় নবীজির বংশধারা ও তাঁর প্রচারিত দ্বিন একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, মদিনার নেতা কাব ইবনে আশরাফ মক্কায় এলে কুরাইশ নেতারা রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করেন। তাঁকে নির্বংশ বলে উপহাস করেন। এসব বিদ্বেষপূর্ণ কথার জবাবে আল্লাহ তাআলা সুরা কাওসার অবতীর্ণ করেন বলে তাফসিরে উল্লেখ রয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি নবীজিকে সান্ত্বনা দেন এবং জানান, প্রকৃতপক্ষে তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই হবে নির্বংশ ও নাম-নিশানাহীন। (তাফসিরে জালালাইন, ৭/৫৯১)
সুরা কাওসারের প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি।’ (সুরা : কাওসার, আয়াত : ১)
এ আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসুল (সা.)-কে কাওসার দানের সুসংবাদ দিয়েছেন। ‘কাওসার’ শব্দের অর্থ প্রচুর কল্যাণ, অফুরন্ত নিয়ামত ও বিপুল প্রাচুর্য। হাদিসে কাওসার বলতে জান্নাতের একটি বিশেষ নহর বা নদীকে বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে দান করবেন।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের মাঝে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ তাঁর তন্দ্রার ভাব হলো। কিছুক্ষণ পর তিনি মুচকি হেসে মাথা তুললেন। সাহাবিরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এইমাত্র তাঁর ওপর একটি সুরা অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর তিনি সুরা কাওসার পাঠ করে সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁরা জানেন কি, কাওসার কী?
সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তখন তিনি বলেন, ‘এটি একটি নহর। আমার প্রতিপালক আমাকে এটি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এতে রয়েছে প্রচুর কল্যাণ। এটি এমন একটি জলাধার, কিয়ামতের দিন আমার উম্মত সেখানে পানি পান করতে আসবে। এর পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির সমান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪০০)
হাউজে কাওসারের মাহাত্ম্য
হাউজে কাওসার জান্নাতের এক বিশেষ নিয়ামত। কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে যখন মানুষ তীব্র পিপাসায় কাতর থাকবে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা তাঁর হাউজ থেকে পানি পান করার সুযোগ পাবেন।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, কাওসার এমন একটি নহর, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে দান করেছেন। এর দুই তীরে রয়েছে মুক্তার তৈরি গম্বুজ। এর পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের তারকারাজির সমান। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯৬৪)
হাউজে কাওসারের পানি হবে পবিত্র, সুস্বাদু ও প্রশান্তিদায়ক। তবে হাদিসে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে যে, নবীজির ইন্তেকালের পর যারা তাঁর দ্বিনের মধ্যে পরিবর্তন এনেছে, তাদের কাউকে কাউকে হাউজে কাওসার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন তাঁর উম্মতের কিছু লোক তাঁর কাছে আসবে। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে হাউজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তখন তিনি বলবেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! সে তো আমার উম্মতের একজন!’ উত্তরে বলা হবে, ‘আপনার জানা নেই, আপনার পরে তারা কী কী পরিবর্তন করেছিল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪০০)
সুরা কাওসারের দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
অর্থ: ‘অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা : কাওসার, আয়াত : ২)
প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুলকে অসংখ্য নিয়ামত দানের সুসংবাদ দিয়েছেন। এরপর দ্বিতীয় আয়াতে সেই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এ আয়াতের শিক্ষা হলো, নামাজ, ইবাদত ও কোরবানিসহ সব ধরনের আনুগত্য একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে।
সুরা কাওসারের শেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই নির্বংশ।’ (সুরা : কাওসার, আয়াত : ৩)
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের পরিণতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যারা পুত্রসন্তান না থাকার কারণে তাঁকে নির্বংশ বলে উপহাস করত, আল্লাহ তাদেরই প্রকৃত নির্বংশ বলে ঘোষণা করেছেন। এর মাধ্যমে নবীজির সম্মান ও মর্যাদা চিরসমুন্নত থাকার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
আজ পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে কোটি কোটি মুসলমান প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করেন। আজান, ইকামত, খুতবা ও নামাজে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়। কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। অন্যদিকে, যারা একসময় তাঁকে উপহাস করেছিল, তাদের অনেকের নাম ও পরিচয় ইতিহাসে প্রায় বিস্মৃত।
সুরা কাওসার তাই শুধু নবীজির প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের ঘোষণা নয়; বরং এটি মুমিনদের জন্য কৃতজ্ঞতা, একনিষ্ঠ ইবাদত, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখারও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।