
'বাংলাদেশ, দয়া করে এই ছেলেটার যত্ন নিন।' পিএসএল চলাকালে বাংলাদেশের উদ্দেশে হাতজোড় করে এমন অনুরোধ করেছিলেন সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার ও বিশ্লেষক ডমিনিক কর্ক। তখন বিষয়টি মনে হয়েছিল ভবিষ্যতের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা। কিন্তু বাস্তবে সেটিই হয়ে ওঠে এক ধরনের অকাট্য পূর্বাভাস। কারণ নাহিদ রানা আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তা শুধু প্রতিভার গল্প নয় বরং বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণের এক বড় স্বস্তি।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে তাকে এখন ‘মি. ১৫০’ নামে ডাকা হচ্ছে, আর সেটি কেবল গতির জন্য নয়। ১৫০ কিলোমিটারের আশেপাশে ধারাবাহিকভাবে বল করার সক্ষমতা তাকে আলাদা করে তোলে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হলো সেই গতিকে কাজে লাগানোর বুদ্ধিমত্তা।
কখন ফুল লেংথে আঘাত করতে হবে, কখন শর্ট বলে ব্যাটসম্যানকে পেছনে ঠেলে দিতে হবে এই বোঝাপড়াই তাকে ‘বাংলাদেশ এক্সপ্রেস’ বানিয়েছে, যে শুধু বলের গতি নয় বরং ম্যাচের গতিও বদলে দিতে পারে।
মজার বিষয় হলো, কেবল স্কোরবোর্ড দেখে এই প্রভাব বোঝা যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, রানা ১০ ওভারে ৬০-এর বেশি রান দিয়েছেন। সাধারণ চোখে এটি খরুচে স্পেল মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরের গল্পটা ভিন্ন।
ওই স্পেলেই হয়তো তিনি টপ অর্ডারের দুই ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, কিংবা এমন চাপ তৈরি করেছেন যার সুফল পেয়েছে অন্য প্রান্তের বোলাররা। ক্রিকেটের পরিসংখ্যান যেখানে শেষ হয় নাহিদের প্রভাব সেখানে শুরু।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাম্প্রতিক ম্যাচটি এই বাস্তবতার সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ। শুরুতেই যখন কিউই ওপেনাররা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছিলেন, তখন ‘মি. ১৫০’ এসে প্রথম বলেই ভেঙে দেন সেই ছন্দ। পরের ওভারে আবারও প্রথম বলেই তুলে নেন উইকেট।
এই দুই আঘাতেই বদলে যায় ম্যাচের গতি। পরে পুরো স্পেলে ৩২ রানে ৫ উইকেট এবং ৪৩টি ডট বল করে কিউই ব্যাটিং লাইনআপকে প্রায় দাঁড়াতেই দেননি রানা।
এর আগেও পাকিস্তানের বিপক্ষে মিরপুরে ২৪ রানে ৫ উইকেট নিয়ে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। খুব অল্প সময়েই একাধিক পাঁচ উইকেট শিকার যা যেকোনো পেসারের জন্য বড় অর্জন।
ওয়ানডেতে প্রথম ১০ ম্যাচেই দুইবার পাঁচ উইকেট নিয়ে মুস্তাফিজুর রহমানের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বোলার হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন রানা। এই পরিসংখ্যান তাকে বিশেষ এক কাতারে নিয়ে গেছে। কিন্তু এখানেও একই কথা সত্য, ‘মি. ১৫০’কে কেবল সংখ্যায় আটকে রাখা যায় না।
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের দীর্ঘদিনের প্রবণতা ছিল রান আটকে রাখার দিকে মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু ‘বাংলাদেশ এক্সপ্রেস’ সেই ধারার বাইরে। তিনি রান দিতে পারেন, তবে সেই রান আসে উইকেটের বিনিময়ে।
আধুনিক ক্রিকেটে উইকেটই যেখানে মূল লক্ষ্য, সেখানে নিষ্প্রাণ উইকেটেও লেংথে বল ফেলে বাড়তি বাউন্স আদায় করা এবং সেট ব্যাটসম্যানকে ভুল করতে বাধ্য করা এই গুণগুলো তাকে আলাদা করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিক দিকটি। একজন ব্যাটসম্যান যখন জানেন সামনে ১৪৫ বা ১৫০ কিলোমিটার গতির বল আসছে, তখন তার সিদ্ধান্ত গ্রহণেও পরিবর্তন আসে। প্রতিটি ডেলিভারিতে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
এই অনিশ্চয়তাই অনেক সময় বড় শটের ভুলে পরিণত হয় কিংবা রান তোলার গতি কমিয়ে দেয়। এই অদৃশ্য চাপই আসলে সবচেয়ে বড় অস্ত্র, যা পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
অনেক সময় দেখা যায়, রানাকে সামলাতে গিয়ে অপর প্রান্তের বোলারকে আক্রমণ করতে যান ব্যাটসম্যানরা। আর তখনই ভুল করে সেই বোলারকেই উইকেট দিয়ে বসেন তারা। ক্রিকেটে এমন নজির অহরহ।
অর্থাৎ রানা শুধু উইকেটই নিচ্ছেন না, তিনি সতীর্থদের জন্যও ব্রেকথ্রুর সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন। তাই নাহিদ রানা কেবল একজন বোলার নন বরং এক ধরনের প্রভাব। তিনি খেললে ম্যাচে সবসময় একটি এক্স ফ্যাক্টর থাকে।
উইকেট না পেলেও বা বেশি রান দিলেও তার উপস্থিতি প্রতিপক্ষকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। এই কারণেই তাকে দলে রাখা কেবল একটি বিকল্প নয় বরং প্রয়োজন।
ডমিনিক কর্কের সেই অনুরোধ তাই এখন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ আজ এমন এক পেসার পেয়েছে, যাকে ঘিরে নতুন করে ভাবা যায়। যিনি কেবল সহায়ক নন বরং ম্যাচ নির্ধারণকারী।
শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের সহজ একটি সত্য আবারও সামনে আসে। গতি, ভয় এবং চাপের মিশেলেই তৈরি হয় এক বিশেষ প্রভাব। আর বাংলাদেশের জন্য এখন সেই প্রভাবের নামই নাহিদ রানা।
আর বাংলাদেশ দলের সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সে রানার এই প্রগাঢ় প্রভাবই মনে করিয়ে দেয় স্যার ভিভ রিচার্ড বা মার্ক ওয়াহ-দের সময়ের সেই পুরনো প্রবাদ বাক্য: 'পেস ইজ পেস আফটার অল'।