তেল ও গ্যাস খাতের কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে শ্রম আইনে নির্ধারিত শ্রমিকদের মুনাফার অংশ গ্রহণের বিধান বাতিল বা সীমিত করার প্রস্তাব শ্রমিক নেতারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, শ্রমিকদের প্রাপ্য ৫ শতাংশ মুনাফা থেকে বঞ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সচিবালয়ে এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নেতা বাবুল আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, “শ্রম আইনের পঞ্চদশ অধ্যায়ে স্পষ্টভাবে বলা আছে—কোনো প্রতিষ্ঠান লাভ করলে সেই লাভের একটি অংশ শ্রমিকদের দিতে হবে। তেল ও গ্যাস খাতের কোম্পানিগুলো সেই আইন বাতিল বা দুর্বল করার প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। আমরা সেটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছি।”
তিনি ঢাকাওয়াচকে জানান, প্রথম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে একটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে সেটিও তাৎক্ষণিক অনুমোদনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাবুল আক্তার বলেন, “সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমরা বলেছি—নতুন সরকার এলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। তবে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করিনি।”
তিনি আরও জানান, আগামী রোববার তেল ও গ্যাস খাতের কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে শ্রমিক নেতাদের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে শ্রমিকস্বার্থ সংরক্ষিত না হলে দেশীয় ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শ্রমিকবিরোধী অবস্থানের বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরা হবে।
কী আছে আইনে
বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান লাভ করলে তার মোট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ করতে হবে। এই ৫ শতাংশের মধ্যে—
৮০ শতাংশ সমান হারে শ্রমিকদের দেওয়া হয়
১০ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে জমা হয়
১০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে রাজস্ব হিসেবে জমা হয়
কিন্তু জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি একটি প্রস্তাব আনা হয়েছে, যাতে শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত এই ৫ শতাংশ বাতিল বা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। বিদেশি আটটি তেল ও গ্যাস কোম্পানি দাবি করছে, এই হার বেশি হওয়ায় তারা তা বহন করতে পারছে না।
শ্রমিক নেতাদের আপত্তি
শ্রমিক নেতারা বলছেন, এই বিধান কেবল লাভের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। লোকসান হলে শ্রমিকদের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। তাই এটি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার।
বাবুল আক্তার বলেন, “কোম্পানিগুলো লাভ করবে, কিন্তু শ্রমিকরা সেই লাভের অংশ পাবে না—এটা হতে পারে না। শ্রমিকরা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান লাভ করতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার দাবি করছে, টেন্ডার বা চুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক চাপ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত
শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন বলেন, “শ্রমিকদের মুনাফার অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই বিধান বাতিল করলে শ্রমিকদের প্রণোদনা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাবে।”
অর্থনীতিবিদ ড. শাহীনুর রহমান বলেন, “বিদেশি কোম্পানির স্বার্থে শ্রম আইন পরিবর্তন করা হলে তা দেশের শ্রম বাজারে নেতিবাচক বার্তা দেবে। এতে শ্রমিক অসন্তোষ বাড়বে, যা উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।”
অনিশ্চয়তায় শ্রমিকরা
শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, আপাতত সরকারি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তবে আলোচনা চালু রাখা হয়েছে। আগামী রোববারের বৈঠকের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাবুল আক্তার বলেন, “আমরা আলোচনায় বসব। কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার খর্ব হলে কোনোভাবেই তা মেনে নেওয়া হবে না।”