
মাথা থেকে ঝরে পড়া ফেলনা জটলা পাকানো চুলই এখন দিনাজপুরের শত শত গ্রামীণ নারীর কর্মসংস্থানের বড় উৎস হয়ে উঠেছে। নামমাত্র মজুরি হলেও অলস বসে না থেকে এই চুল বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে যুক্ত হয়ে নিজেদের ভাগ্যবদলের চেষ্টা করছেন তাঁরা। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ৫নং খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের নলডাঙ্গা গ্রামে দৈনিক হাজিরার চুক্তিতে একদল নারীশ্রমিক নিয়মিত মেয়েদের ঝরে পড়া চুলের গুটি থেকে চুল বাছাই ও পরিষ্কারের কাজ করে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে নলডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের জহুরুল শেখের খোলানের এক পাশে ওই গ্রামেরই একদল নারী দল বেঁধে মেয়েদের ঝরে পড়া চুলের গুটি থেকে ময়লা ঝেড়ে পরিষ্কার করছেন। এই কাজে দৈনিক ৭০ টাকা দিনমজুরিতে ১৬ জন নারীশ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। সেই হিসাবে একজন সাধারণ নারী শ্রমিক প্রতি মাসে এই কাজ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা আয় করছেন। অন্যদিকে, পুরো কাজের তদারকি ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা দলনেত্রীর দৈনিক মজুরি ৮০ টাকা, যার মাধ্যমে তাঁর মাসিক আয় হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। একই গ্রামের নূর আলমের স্ত্রী জহুরা বেগম এই দলের নেত্রী হিসেবে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছেন।
দীর্ঘ সময় ধরে এই সূক্ষ্ম কাজ করার বিষয়ে রাজিয়া বেগম নামের এক শ্রমিক বলেন, "গত এক মাস থেকে এ কাজে যোগ দিয়েছেন। সকাল ৭ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত গুটির চুল ঝারার কাজ করতে হয় তাদেরকে। চুল কারখানার লোকজন সকালে গুটি চুল দিয়ে যান এবং দুপুর ২টার পর ঝারা চুল নিয়ে যান। দীর্ঘ সময় কাজ করলেও মজুরি খুবই কম। তবুও বেকার থাকার চেয়ে এ কাজ করে হলেও কিছু আয় হচ্ছে বলে কাজ করছেন তারা।"
একই কাজে অংশ নেওয়া মনিকা বেগম নামের আরেকজন নারীশ্রমিক নিজের পরিবর্তনের কথা জানিয়ে বলেন, "আগে কোনো কাজ না থাকায় বাড়ীর রান্নাবান্নার পর অলস সময় কাটতো। সময় না কাটলে এ বাড়ী ও বাড়ী গিয়ে সময় কাটাতে হতো। কিন্তু চুল ঝারা কাজে যোগ দিয়ে সকাল থেকে সারাদিন ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটছে এবং কিছু আয়ও হচ্ছে। যা সংসারের অনেক কাজে লাগছে।"
বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চড়া দামের বাজারে এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো কঠিন বলে জানান দলনেত্রী জহুরা বেগম। তিনি বলেন:
"শুধু নলডাঙ্গা নয়, চুল পার্শ্ববর্তী গোয়ালপাড়া, খয়েরবাড়ী ডাঙ্গা, শিবপুরসহ উপজেলার প্রায় সব গ্রামেই গ্রামের নারীরা মেয়েদের ঝরে পড়া চুল ঝাড়ার কাজ করছেন। আমরা গরীব মানুষ দিন আনি দিন খাই। বাসায় বসে না থেকে এখানে চুলের কাজ করি। সারাদিন কাজ করে ৮০ টাকা পাই। মাসে ৩০ দিন কাজ করলে দুই হাজার ৪০০ টাকা পাই। বর্তমান বাজারে সবকিছুর দাম বেশি কিন্তু আমাদের মত নারী শ্রমিকদের মজুরি কম। মেয়েদের মাথা থেকে পড়ে যাওয়া চুলের কাজ করি। এ চুলগুলো জটলা লেগে থাকে সেগুলো আমরা কাটা দিয়ে আস্তে আস্তে খুলি। সকাল বেলা বাড়ীর কাজ করে ৭টার দিকে খোলানে আসি। আবার নাস্তার জন্য ১০টার সময় ৩০ মিনিট ছুটি পাই। নাস্তা খেয়ে আমার বসি কাজে। এর পরে দুপুর ২টায় কাজ শেষ করে নিজ নিজ বাড়ী চলে যাই। এ টাকা দিয়ে সংসার চলে না। কিন্তু উপায় না পেয়ে কষ্ট হলেও কাজ করতে হয়।"
যেভাবে হয় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চড়া বাজারমূল্য
সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জানা গেছে, ঝরে পড়া এই গুটি চুলগুলো প্রথমে নারীশ্রমিকদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় জট ছাড়িয়ে আলাদা করা হয় এবং প্রাথমিকভাবে পরিষ্কার ও বাছাইয়ের কাজ চলে। এরপর সেই বাছাই করা চুলগুলো ডিটারজেন্ট পাউডার ও শ্যাম্পু মিশ্রিত পানিতে দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রেখে খুব ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় পুরোপুরি পরিষ্কার করার পর এই চুলগুলো মূল কারখানার ভেতরে নিয়ে কাটিং মেশিনের সাহায্যে নিখুঁতভাবে কাঁচি বা সাইজ করা হয়। এরপর সমমাপের কাঁচি করা চুলগুলোকে একসঙ্গে রাবার দিয়ে ছোট ছোট গোছায় বেঁধে আলাদা করা হয়, যাকে কারখানার ভাষায় 'লাচি' বলা হয়ে থাকে।
চূড়ান্তভাবে প্রক্রিয়াজাত করা এই চুলের বাজারমূল্য মূলত নির্ভর করে এর দৈর্ঘ্যের ওপর। চুল যত বেশি লম্বা হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে এর দর তত চড়া হবে। চুলের এই দৈহিক পরিমাপ বা ইঞ্চির ওপর ভিত্তি করে এর বাজারমূল্য সর্বনিম্ন ৬ ইঞ্চি সাইজের চুল প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২২-৩২ ইঞ্চি সাইজের চুল প্রতি কেজি ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। এই ২২ থেকে ৩২ ইঞ্চি মালের লম্বা চুলকে এই শিল্পের সর্বোচ্চ গ্রেডের বা প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চুল ধরা হয়।
এই শিল্পের স্থানীয় প্রসার নিয়ে চুল বাছাই কারখানার স্থানীয় ম্যানেজার আরজন আলী জানান, বর্তমানে ফুলবাড়ী উপজেলার মোট ১২টি কেন্দ্রে এই চুল ঝাড়ার কাজ পুরোদমে চলছে। প্রতি কেন্দ্রে ৮ থেকে ১৬ জন নারীর সমন্বয়ে এক একটি দল কাজ করে এবং এদের প্রত্যেকেরই একজন করে দলনেত্রী রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় কেন্দ্রগুলোতে চুলগুলো প্রাথমিকভাবে ঝাড়া ও জট ছাড়ানোর পর নবাবগঞ্জ মতিহারা প্রধান কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিখুঁত ফিনিশিং ও কারখানার অভ্যন্তরীণ কাজ শেষ করে এগুলো সরাসরি ঢাকায় পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ঢাকা থেকে এই প্রক্রিয়াজাত করা চুল চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে। বর্তমানে ফুলবাড়ী ও নবাবগঞ্জসহ এই অঞ্চলের কয়েকটি উপজেলায় অন্তত চার হাজার প্রান্তিক নারী এই কাজের মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন।