
মাত্র ২০ সেকেন্ডের এক অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক লাইফলাইন! বড় ধরনের একটি প্রলয়ংকরী ট্র্যাজেডি এবং নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছেন একটি যাত্রীবাহী বাসের ৩৭ জন আরোহী। ফেরিতে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে নিয়ম মেনে বাস থেকে নেমে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান তাঁরা।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে ‘এসবি পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন ও ফেরির রেলিং ভেঙে সরাসরি পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়।
ভয়াবহ এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে সেই বাসের প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রী আব্দুস সালাম বলেন, "আমি ও আমার পরিবার শুক্রবার (৫ জুন) সকাল ৭টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে এসবি পরিবহনের ওই বাসে উঠি। যদিও বাসটি তার নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় ২০ মিনিট দেরিতে ছেড়েছিল। দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর নিয়ম অনুযায়ী আমাদের সব যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। আমি মনে করি, আল্লাহ স্বয়ং পুলিশ পাঠিয়েছেন, আমাদের বাস থেকে নামিয়ে দিতে। আমরা নামার ২০ সেকেন্ডের মধ্যেই চোখের সামনে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মার পানিতে তলিয়ে যায়। ২০ সেকেন্ড দেরি হলে সবাই শেষ হয়ে যেতাম। ৩৭ জন যাত্রী ছিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা বেঁচে গেছি, কারণ ওই সময় বাসে চালক ছাড়া কোনও যাত্রী ছিল না।"
ঘাট কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখী বাসটি দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটে নোঙর করে থাকা ‘করবী অক্সফাম’ নামের একটি ছোট ইউটিলিটি ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করছিল। তবে প্রশাসনের কড়া নির্দেশনা মেনে ফেরিতে গাড়ি তোলার আগেই বাসের ভেতর থাকা সব আরোহীকে বাইরে নামিয়ে দেওয়া হয়।
বাসটি যখন পন্টুন পেরিয়ে ফেরির দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই সেটির ব্রেক ফেল বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা ঘটে। বিপদ আঁচ করতে পেরে বাসের সহকারী (হেলপার) সাকিব হোসেন (২৭) চলন্ত গাড়ি থেকে ফেরির পন্টুনের ওপর লাফিয়ে পড়েন। এতে তিনি সামান্য আঘাত পান। তবে চালক ঝন্টু আলী (৪৭) বাসসহ সরাসরি গভীর নদীতে পড়ে যান। অত্যন্ত সৌভাগ্যবশত, বাসটি ডুবতে শুরু করলে চালক কৌশলে জানালার কাচ গলে বের হয়ে নদী সাঁতরে ওপরে উঠতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে আহত চালক ও সহকারী দুজনকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য দ্রুত গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
সেখানে ডিউটিরত প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘাট পারাপারে নিয়োজিত মারুফ বিল্ডার্সের ম্যানেজার শুভ সেন ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি ৭ নম্বর ঘাটের পন্টুনে দাঁড়িয়ে একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় দেখতে পান, এসবি পরিবহনের ওই বাসটি ফেরিতে ওঠার জন্য অ্যাপ্রোচ সড়কের দিকে আসছে। তবে সেখানে নিয়োজিত নৌ-পুলিশ ও অন্যান্যরা বাসটি হতে যাত্রীদের নেমে যেতে বলেন। যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর চালক বাসটি নিয়ে সোজা ফেরিতে উঠে যান। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সোজা গিয়ে ফেরির রেম বা ডালায় গিয়ে আঘাত করে। এতে ডালার তার ছিড়ে গিয়ে বাসটি নদীতে পড়ে যায়।
বড় ধরনের এই দুর্ঘটনার পরও কোনো মানুষ হতাহত না হওয়ায় মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বাসের সুপারভাইজার আজমল হোসেন। তিনি জানান, "বাসটিতে ৪০ জন টিকিট কাটলেও যাত্রী ওঠেন ৩৭ জন। তাদের নিয়েই ঢাকা যাচ্ছিলাম। তবে আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে সব যাত্রী নেমে যাওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানির হাত থেকে আমরা বেঁচে যাই।"
এদিকে যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ছুটে আসেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন। সে সময় তাঁর সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাথী দাস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মুনতাসির হাসান খান, গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম, দৌলতদিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ওসি ত্রিনাথ সাহা এবং বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক মো. সালাউদ্দিনসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, "প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে যাত্রীদের আগেই নামিয়ে দেওয়ায় কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। আমরা পরিবহন সংশ্লিষ্টসহ সব যাত্রীদের কাছে অনুরোধ করবো এভাবেই ফেরিতে উঠার আগে বাস থেকে সবাই নেমে যাবেন।"
অবশেষে দুর্ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা পর বেলা পৌনে ১২টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’, গোয়ালন্দ ফায়ার সার্ভিস ও দক্ষ ডুবুরি দলের যৌথ প্রচেষ্টায় নদী থেকে অত্যন্ত সুচারুভাবে বাসটিকে টেনে তুলতে সক্ষম হয়। উদ্ধার হওয়া বাসের ভেতরে কোনো আটকা পড়া লাশ বা মানুষ ছিল না বলে অফিশিয়ালি নিশ্চিত করেছেন দৌলতদিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ত্রিনাথ সাহা।
প্রসঙ্গ উল্লেখ্য, বিগত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস একইভাবে নদীতে ডুবে যাওয়ার কারণে ২৬ জন সাধারণ যাত্রীর মর্মান্তিক সলিলসমাধি ঘটেছিল। সেই দুঃসহ স্মৃতির ক্ষত কাটতে না কাটতেই আজকের এই ঘটনা ফেরিঘাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এল।