
সুন্দরবনের ভেতরে টানা দুই দিনে বিভিন্ন নদী ও খালে মাছ, কাঁকড়া ও মধু আহরণের সময় অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন জেলে ও মৌয়ালকে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনায় বননির্ভর জীবিকায় থাকা মানুষদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে গহীন সুন্দরবন থেকে ফিরে আসা কয়েকজন বনজীবীর সঙ্গে থাকা সহযোগীরা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তারা জানান, সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত চুনকুড়ি নদী, ধানো খালীর খাল, মামুন্দো নদী এবং মালঞ্চ নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে সশস্ত্র একটি দল নৌকায় থাকা জেলে ও মৌয়ালদের লক্ষ্য করে এই অপহরণের ঘটনা ঘটায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আলিম ওরফে আলিফ বাহিনী’ ও ‘ডন বাহিনী’ নাম ব্যবহার করে পরিচয় দেওয়া ওই সশস্ত্র দল প্রতিটি নৌকা থেকে একজন করে মানুষকে তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। ঘটনাটি বিভিন্ন খাল ও নদীপথে একযোগে ঘটায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
নিশ্চিত হওয়া পরিচয়ের মধ্যে রয়েছেন শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের জেলে ও বনজীবীরা। তাদের মধ্যে কিশোর থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী ও প্রবীণ শ্রমজীবী মানুষও রয়েছেন। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে আরও কয়েকজনের নাম প্রকাশ করেননি সহকর্মীরা।
অপহরণের পরপরই কয়েকজন ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবারগুলোর দাবি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কয়েকজনের জন্য টাকার অঙ্কও জানানো হয়েছে। তবে অন্যদের বিষয়ে এখনো কোনো দাবি আসেনি বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সুন্দরবনে দীর্ঘদিন ধরেই একই ধরনের সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। তারা জেলে ও মৌয়ালদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়সহ নানা ধরনের চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছে। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতির কারণে এসব গোষ্ঠী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলেও অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় বনজীবীরা জানান, পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন অপহরণ ছাড়াও বনজ সম্পদ লুট এবং বন্যপ্রাণী শিকারের মতো অপরাধও বেড়েছে বলে তারা দাবি করেন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক জানান, অপহরণের খবর তারা পেয়েছেন, তবে অনেক ভুক্তভোগীর পরিবার নিরাপত্তার কারণে বিস্তারিত তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছে।
শ্যামনগর থানার ওসি খালেদুর রহমান বলেন, অনেক সময় বনজীবীরা নিজেরাই আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন, ফলে প্রশাসনের কাছে তথ্য আসে দেরিতে। তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সুন্দরবনের ভেতরে এ ধরনের ধারাবাহিক অপহরণ বনজীবীদের জীবিকা ও নিরাপত্তা দুটিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত বনদস্যুতা এখন আরও সংগঠিত রূপ নিচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও সমন্বিত অভিযান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।