
‘জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন, ছিলেন হিন্দু ধর্মের অনুসারী’ বলে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরামের নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে ফজলুর রহমান বলেন, ‘মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৭৬ সালে বোম্বেতে জন্মগ্রহণ করেন। সেই গুজরাটের একটা খোজা পরিবারের, যারা মাছ বিক্রি করত। তবে ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্রে জিন্নাহর বাবা জিন্নাহভাই পুঞ্জাকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানের সরকারি সূত্রে তাঁর পরিবারকে গুজরাটের প্যানেলি গ্রামের মুসলিম ব্যবসায়ী পরিবার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন তুলে ধরে ফজলুর রহমান বলেন, তিনি প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯২৯ সালে তাঁর ঘোষিত ১৪ দফায় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক দাবি ছিল।
তাঁর ভাষ্য, ‘১৪ দফা দিল, হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি করল, জিন্নাহ একটা পাকিস্তান বানাইলো।’
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি নেতাদের ভূমিকার প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন, ‘পাকিস্তান আমরা সবাই মিলেই বানাইছিলাম, আমরা তো অস্বীকার করি না। কিন্তু বানাইয়া যখন দেখলাম পাকিস্তান ভালো না, তখন ৫২ সালেই আমরা ফাইট শুরু করলাম।’
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা ধর্মীয় জাতীয় সত্তায় নয়, আমরা নৃতাত্ত্বিক জাতীয় সত্তায়, ভাষাভিত্তিক জাতীয় সত্তায় আমরা দেশ বানাইতে চাই।’
তিনি বলেন, ৫২ সনের ভাষা আন্দোলন এবং তার পথ ধরে ৫৪’র ইলেকশন, ৫৮’র আইয়ুব খানের শাসন।
এরপর ছয় দফা, ১১ দফা ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলন এগিয়ে যায়।
১৯৭০ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন, ‘সারা পাকিস্তানে মেজরিটি ভোট পায় শেখ মুজিবুর রহমান। এরপরও ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় যুদ্ধ শুরু হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
মুক্তিযুদ্ধে নিজের অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স তখন ২৩ বছর। আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। যুদ্ধে যাই নাই শুধু, যুদ্ধকে সংগঠিত করেছিলাম।’
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘This is not the arms that fights, but the man behind the arms, and ideology behind the man that fights।’
জাতীয় পতাকা ও ‘আমার সোনার বাংলা’ গান নির্বাচনের সময়কার স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সমালোচনা করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধই সত্য। যখন কেউ বলছে মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই তখন সেই কথা আমার বুকে লাগছে।’
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সত্যের পথে চলো। সত্য কথা বলো। অন্ধকারকে আলোকিত করার জন্য অন্তত একটা মোমবাতি হলেও হাতে নাও।’
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। উদ্বোধক ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলফারুন নাহার রুমার সভাপতিত্বে এবং রবীন্দ্র সৃজন কলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মো. নিজাম উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার খন্দকার নাজমুল হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম বেগম, কিশোরগঞ্জ জেলা পাবলিক কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব ও সদস্য সচিব মামুন সরকারসহ প্রমুখ।