
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনে জনসংখ্যা হ্রাসের ধারা থামছে না। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও দেশটির জনসংখ্যা কমেছে, ফলে টানা চার বছর ধরে এই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রইল। জন্মহার রেকর্ড পরিমাণে নেমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি তথ্যে জানানো হয়েছে, গত বছরে চীনের জনসংখ্যা কমেছে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার। সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪০ কোটি ৫০ লাখে। একই সময়ে জন্মহারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে জন্ম নিয়েছে মাত্র ৭৯ লাখ ২০ হাজার শিশু, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে চীনে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখে পৌঁছেছে, যা ১৯৬৮ সালের পর সর্বোচ্চ। প্রতি এক হাজার জনে জন্মহার নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৬৩-এ।
উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষজ্ঞ বলেন, “২০২৫ সালের জন্মহার ১৭৩৮ সালের স্তরের কাছাকাছি, যখন চীনের মোট জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ কোটি।”
বয়স্ক জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক চাপ
২০২২ সাল থেকেই চীনের জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছে এবং একই সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৪০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে কর্মক্ষম জনশক্তি কমে গিয়ে পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুরুষদের অবসর বয়স ৬৩ বছর এবং নারীদের ৫৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিয়ে কমা ও এক সন্তান নীতির প্রভাব
জন্মহার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিয়ের হার হ্রাসকে চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৪ সালে চীনে বিয়ের সংখ্যা রেকর্ড ২০ শতাংশ কমে যায়। তবে ২০২৫ সালে বিয়ের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার পর বছরের শেষ দিকে বিয়ের হার কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে।
এছাড়া ১৯৮০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকা ‘এক সন্তান নীতি’ চীনা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। পারিবারিক ও সামাজিক মানসিকতায় যে পরিবর্তন এসেছে, তা এখন জন্মহার বাড়ানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জন্মহার বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ
শহুরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আবাসন সংকটের কারণে সন্তান নিতে অনীহা বাড়ছে বলে মনে করছে সরকার। এই সংকট মোকাবিলায় বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, জন্মহার বাড়াতে চলতি বছরে চীন প্রায় ২ হাজার ৫৮০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করতে পারে।
নতুন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে জাতীয় শিশু ভাতা কর্মসূচি, যা গত বছর থেকে চালু হয়েছে। এছাড়া ২০২৬ সাল থেকে গর্ভবতী নারীদের সব চিকিৎসা ব্যয়, এমনকি আইভিএফ চিকিৎসাও সরকারি বিমার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে চীনে মোট প্রজনন হার একজন নারীর ক্ষেত্রে গড়ে ১টি সন্তানে নেমে এসেছে, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীর সংখ্যা তিন-চতুর্থাংশ কমে ১০ কোটির নিচে নেমে আসতে পারে।