
রাজধানীতে সব ধরনের চালের দাম নতুন করে আরও এক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের চাহিদার শীর্ষে থাকা মিনিকেট, নাজিরশাইল, আটাশ ও সুগন্ধি চালের দাম মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মানভেদে কেজিতে ৩ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, বড় বড় মিল মালিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ধান মজুত করার মানসিকতা এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চালের বাজার এভাবে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দাম আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
আজ শুক্রবার (৩ জুলাই) রাজধানীর অন্যতম প্রধান পাইকারি ও খুচরা বাজার কারওয়ান বাজার ঘুরে দরদামের এই চড়া চিত্র দেখা গেছে। বিক্রেতারা জানান, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ধাপে ধাপে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে।
কোন চালের দাম কত বাড়ল?
মিনিকেট চাল: প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়ে সাগর, মুজাম্মেল, মুনজুর ও মজুমদার কোম্পানির মিনিকেট এখন ৭৫ থেকে ৭৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এগুলোর ৫০ কেজির বস্তার দাম ঠেকেছে ৩ হাজার ৭০০ টাকায়। অন্যদিকে মা ভাণ্ডারী, এআর ও রশিদ কোম্পানির মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে, যার বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) খরচ পড়ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা।
নাজিরশাইল চাল: এই চালের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পালকি, আকিজ ও মজুমদার কোম্পানির ২৫ কেজির নাজিরশাইলের বস্তা এখন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম পড়ছে ৮২ থেকে ৮৪ টাকা। তবে পালকি, ডায়মন্ড ও শক্তি প্রিমিয়াম কোম্পানির নাজিরশাইল কিছুটা কম দামে, প্রতি কেজি ৭২ টাকা (২৫ কেজির বস্তা ১ হাজার ৮০০ টাকা) দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
আটাশ চাল: আমিন, এনবি, জোরাশালী ও আল রাজ্জাক কোম্পানির আটাশ চালের দাম কেজিতে ৪ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৫৪ টাকা হয়েছে। এর ৫০ কেজির বস্তা কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ টাকা।
সুগন্ধি চাল: এরফান, মুজাম্মেল, আকিজ ও তীর কোম্পানির চিনিগুঁড়া চাল এখন প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এর ৫০ কেজির এক বস্তার দাম পড়ছে ৮ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া সাগর, মুনজুর ও গ্রামীণ কোম্পানির সুগন্ধি চাল প্রতি কেজি ১৬০ টাকা এবং ৫০ কেজির বস্তা ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দুই সপ্তাহ আগের বাজারচিত্র কেমন ছিল?
মাত্র ১৪ দিন আগেও চালের বাজার এতটা উত্তপ্ত ছিল না। তখন মানভেদে ৫০ কেজির এক বস্তা মিনিকেট ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় পাওয়া যেত। সে সময় ভালো মানের মিনিকেট কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৭২ টাকা এবং সাধারণ মানের মিনিকেট ৬৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
একইভাবে দুই সপ্তাহ আগে ২৫ কেজির নাজিরশাইল বস্তার দাম ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা। তখন ভালো মানের নাজিরশাইল ৭৪ থেকে ৭৬ টাকা এবং সাধারণ মানের চাল ৬৬ টাকা কেজিতে কেনা যেত। আটাশ চালের ৫০ কেজির বস্তা সে সময় বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম ছিল ৫০ টাকা। এমনকি গত সপ্তাহেও সুগন্ধি চালের ৫০ কেজির বস্তা ৭ হাজার ৭০০ থেকে ৮ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে ছিল, যা কেজিতে পড়েছিল ১৫৪ থেকে ১৭০ টাকা।
ঊনত্রিশ ও বাসমতি
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া চালগুলোর দাম বাড়লেও ঊনত্রিশ ও বাসমতি চালের দাম এখনো আগের মতোই স্বাভাবিক রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাজী রাইস এজেন্সির এক কর্মচারী জানান, ঊনত্রিশ চাল প্রতি কেজি ৬০ টাকা (৫০ কেজির বস্তা ৩ হাজার টাকা) এবং বাসমতি চাল প্রতি কেজি ৯০ টাকা (৫০ কেজির বস্তা ৪ হাজার ৫০০ টাকা) দরে বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের মতে, সুগন্ধি চালের দাম গত ছয় মাস ধরে একটানা বাড়ছে। এর সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে মিনিকেট ও নাজিরশাইলের দাম বৃদ্ধি।
নোয়াখালী রাইস ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাওন বাজারের এই অস্থিরতার নেপথ্য কারণ তুলে ধরে বলেন:
"মিল মালিক ও কর্পোরেট কোম্পানিগুলো কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে মজুত করছে। পরে তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে। এর ফলে আমাদেরও বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে।"