
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর আগে আওয়ামী লীগের দেড় যুগের শাসনামলে সংঘটিত গুমের ঘটনায় ভয়াবহ তথ্য সামনে এনেছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। কমিশনের চূড়ান্ত হিসাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এ সময়ে অন্তত ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ এবং তাঁদের মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া গুমের নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর আরও ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’-এর শিকার হয়েছেন কিংবা নদীতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছেন। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ও মরদেহ উদ্ধারের এই তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয়— কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা পড়া সীমিতসংখ্যক অভিযোগ থেকেই অন্তত ২৮৭টি মৃত্যুর ঘটনা সরাসরি গুমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদনটি হস্তান্তর করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশনে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসবের মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ পড়েছে ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ শ্রেণিতে।
কমিশন জানায়, তদন্ত শেষে ১১৩টি অভিযোগ গুমের আইনি সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না বলে বিবেচিত হয়েছে। কোনো কোনো ঘটনায় অভিযুক্তরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিলেন না, আবার কিছু ক্ষেত্রে নিয়মিত গ্রেপ্তার হলেও হেফাজতে থাকার সময় ২৪ ঘণ্টার কম ছিল।
তবে কমিশনের ধারণা, প্রকৃত গুমের সংখ্যা জমা পড়া অভিযোগের তুলনায় অনেক বেশি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাপ্ত ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সম্ভবত মোট ঘটনার এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ মাত্র। এই হিসাবে সম্ভাব্য গুমের প্রকৃত সংখ্যা আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গুমের ঘটনায় র্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে। বছরভিত্তিক ও বাহিনীভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট অভিযোগের প্রায় এক-চতুর্থাংশে র্যাবের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
কোন দলের কত গুম
কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গুম হওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের ধরন ও লক্ষ্যবস্তু বোঝার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে স্পষ্ট হয়, কারা ঝুঁকির মুখে ছিলেন এবং কীভাবে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় শনাক্ত করা গেছে ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশের (৯৪৮ জন)। ক্ষমতাসীন দল-সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
পরিসংখ্যান বলছে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৪৭৬ জন (৫০.২ শতাংশ), ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৩৬ জন (২৪.৯ শতাংশ), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ১৪২ জন (১৫ শতাংশ), জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ৪৬ জন (৪.৯ শতাংশ) এবং জাতীয়তাবাদী যুবদলের ১৭ জন (১.৮ শতাংশ)।
কমিশনের মতে, এই চিত্র প্রমাণ করে যে গুম ও সংশ্লিষ্ট নির্যাতন রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল না। বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই তুলনামূলকভাবে বেশি শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির ও বিএনপির মধ্যে ভুক্তভোগীর আধিক্য ইঙ্গিত দেয়— এটি কোনো এলোমেলো পদক্ষেপ নয়; বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
প্রতিবেদন আরও বলছে, ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ ছিল ছাত্র ও যুব সংগঠনের সদস্য। এতে বোঝা যায়, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণরা বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। এই প্রবণতা রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও বিরোধী দল দমনের সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।
কমিশনের হিসাবে, নিশ্চিত রাজনৈতিক পরিচয় থাকা নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী প্রায় ৬৮ শতাংশ। এ ছাড়া এখনো নিখোঁজদের প্রায় ২২ শতাংশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত।
গুম হয়েছেন ২৩ জন নারী
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ১ হাজার ৫৪৬ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে পুরুষ ছিলেন প্রায় ৯৮.৫ শতাংশ এবং নারী ২৩ জন, যা প্রায় ১.৫ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, গুমের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন পুরুষরা— যা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সামাজিকভাবে নির্ধারিত পুরুষের ভূমিকার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে কমিশন মনে করে, নারী ভুক্তভোগীর প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে। অনেক পরিবার সামাজিক কলঙ্ক, ভয় ও চাপের কারণে নারীদের গুমের ঘটনা জানাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে। কোথাও কোথাও সরাসরি অভিযোগ দিতেও অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। ফলে নারী ভুক্তভোগীদের এই কম সংখ্যা নীরবতা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবুও কমিশনের মতে, নারীদের গুমের ঘটনাগুলো তাদের বিশেষ ঝুঁকি ও দুর্বলতার কারণে বাড়তি গুরুত্ব দাবি করে।
কোন বছরে কত গুম
বছরভিত্তিক বিশ্লেষণে কমিশন দেখতে পেয়েছে, গুম কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক আইনশৃঙ্খলা সমস্যার ফল নয়; বরং এটি রাজনৈতিক চাপ, নির্বাচন, নিরাপত্তা সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে গুমের ঘটনা ছিল ১০টি, ২০১০ সালে ৩৪, ২০১১ সালে ৪৭, ২০১২ সালে ৬১, ২০১৩ সালে ১২৮, ২০১৪ সালে ৯৫, ২০১৫ সালে ১৪১, ২০১৬ সালে ২১৫, ২০১৭ সালে ১৯৪, ২০১৮ সালে ১৯২, ২০১৯ সালে ১১৮, ২০২০ সালে ৫১, ২০২১ সালে ৯৫, ২০২২ সালে ১১০, ২০২৩ সালে ৬৫ এবং ২০২৪ সালে ৪৭টি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গুমের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০১২ সালের পর এই প্রবণতা আরও তীব্র হয় এবং দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত উচ্চমাত্রায় থাকে। ২০১৮ সালের পর কিছুটা কমলেও পুরোপুরি থামেনি।
কমিশন সতর্ক করেছে, এই বছরভিত্তিক তথ্যকে চূড়ান্ত ঐতিহাসিক নথি হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশেষ করে ২০১২ সালের আগের তথ্য প্রকৃত ঘটনার ন্যূনতম প্রতিফলন হতে পারে। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী ফিরে এলেও ভয় ও মানসিক আঘাতের কারণে অভিযোগ করেননি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৩ সালে গুমের ঘটনায় বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা যায়, যা ২০১৪ সালের জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই চিত্র দেখা গেছে ২০১৮ সালের নির্বাচনকেন্দ্রিক সময়েও। এমনকি জাতীয় নির্বাচন না থাকলেও ২০২২ সালে রাজপথের আন্দোলন ও সংঘাতের সময়ে গুমের সংখ্যা আবার বাড়তে দেখা যায়।