
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে তিনটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও সে সময় তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার শারীরিক অবস্থা ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় দলটি আগেভাগেই ওই তিন আসনে ‘বিকল্প’ প্রার্থী নির্ধারণ করে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বগুড়া-৭ (গাবতলী ও শাহজাহানপুর) আসনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুর্শেদ মিল্টন, দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে পৌরসভার সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবং ফেনী-১ (সদর) আসনে রফিকুল ইসলাম মজনুকে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
এরই মধ্যে ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলে প্রার্থিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। পরে নির্বাচন কমিশন জানায়, যাচাই-বাছাইয়ের আগেই প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় নতুন তফসিল ঘোষণার প্রয়োজন নেই। এর পরপরই তিন বিকল্প প্রার্থী নিজ নিজ আসনে ধানের শীষের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হন। বুধবার তারা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রতীক সংগ্রহ করেন এবং বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারে নামেন।
বগুড়া-৭ আসন
১৯৯১ সাল থেকে বগুড়ার দুটি আসন—বগুড়া-৬ (সদর) ও বগুড়া-৭ (গাবতলী ও শাহজাহানপুর)—খালেদা জিয়ার নির্বাচনী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই দুই আসনে তিনি কখনো পরাজিত হননি। বগুড়া-৭ আসনের ১২টি নির্বাচনের মধ্যে বিএনপি ছয়বার (এর মধ্যে খালেদা জিয়া পাঁচবার), জাতীয় পার্টি তিনবার, আওয়ামী লীগ দুইবার এবং একবার স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির সমর্থনে) জয়ী হয়েছেন।
খালেদা জিয়া চারবার বগুড়া-৬ আসন রেখে বগুড়া-৭ ছেড়ে দেন। ২০১৮ সালে কারাদণ্ডের কারণে তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারলে বিএনপি কৌশলগতভাবে একাধিক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। সে সময় বগুড়া-৭ আসনে মুর্শেদ মিল্টনের মনোনয়ন বাতিল হলে বিএনপি স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম বাবলুকে সমর্থন দেয় এবং তিনি নির্বাচিত হন। এবার আবারও মুর্শেদ মিল্টনকে এই আসনে প্রার্থী করেছে দলটি। ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই নেতা তিনবার গাবতলী পৌরসভার মেয়র এবং একবার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। আওয়ামী লীগ আমলে তার বিরুদ্ধে ৭০টি মামলা হয়েছিল।
ফেনী-১ আসন
খালেদা জিয়ার পৈত্রিক নিবাস ফেনী। ফেনী-১ (ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া) আসনে তার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মজনু। ১৯৭৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ দশকে এই আসনে বেশিরভাগ সময় বিএনপির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। খালেদা জিয়া নিজে পাঁচবার—১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে—এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০১ সালে তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচনে তার ছোট ভাই সাঈদ ইস্কান্দার বিজয়ী হন। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে এবং ২০১৮ সালে দণ্ডিত হওয়ায় খালেদা জিয়া প্রার্থী হতে না পারলে রফিকুল ইসলাম মজনু দলীয় প্রার্থী হন। এবারও তাকে ফেনী-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
দিনাজপুর-৩ আসন
দেশ বিভাগের পর খালেদা জিয়ার পরিবার দিনাজপুরে বসবাস শুরু করে। শৈশব ও শিক্ষাজীবন সেখানেই কাটলেও তিনি কখনো এই আসন থেকে নির্বাচন করেননি। দিনাজপুর-৩ আসনে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তার বড়বোন খুরশীদ জাহান হক প্রার্থী হন।
১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে এখানে বিএনপি জয় পায় ১৯৭৯, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে। ১৯৭৯ সালে রেজওয়ানুল হক ইদু চৌধুরী প্রথম বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন, পরবর্তী দুইবার জয়ী হন খুরশীদ জাহান হক।
এবার দলটি পরীক্ষিত নেতা ও সাবেক পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমকে দিনাজপুর-৩ আসনে প্রার্থী করেছে। আশির দশকে ছাত্রদলে যুক্ত হয়ে রাজনীতিতে আসা জাহাঙ্গীর আলম জেলা বিএনপির সভাপতি, স্বেচ্ছাসেবক দলের জেলা আহ্বায়ক এবং পরে রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। এরশাদের শাসনামলে একটি রাজনৈতিক হত্যা মামলায় প্রথম গ্রেপ্তার হওয়ার পর আওয়ামী লীগ আমলেও তাকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। পৌর মেয়র থাকাকালে দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হলেও সব মামলাতেই তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন।