
কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় একটি বিতর্কিত চরের মালিকানা ধরে রাখাকে কেন্দ্র করে দুই ভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া আর ইটপাটকেল নিক্ষেপের জেরে রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া এই ঘটনায় উভয়পক্ষের কম করে হলেও ৪০ জন আহত হয়েছেন।
সোমবার (১৫ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলার তিতাস উপজেলার নতুন ভাটেরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে পার্শ্ববর্তী মেঘনা উপজেলার বিনতপুর ও আলীরচর গ্রামের লোকজনের মধ্যে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
সংঘর্ষের পরপরই আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ নিজ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত থাকায় তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরিভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিতাস উপজেলার চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের মধ্যে সুলতানা মিয়া (৫৫), নাছির উদ্দিন (৫২) ও মো. কবির মিয়াসহ (৪৫) অন্তত ১৫ জন রয়েছেন। অপরদিকে, প্রতিপক্ষ মেঘনা উপজেলার বিনতপুর ও আলীরচর গ্রামের প্রায় ২৫ জন জখম হয়েছেন, যাদের মধ্য থেকেই তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়।
স্থানীয় নথিপত্র ও ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় ২০ বছর আগে নতুন ভাটেরারচর গ্রামের পশ্চিম পাশের একটি চরের মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে। পরবর্তীতে আদালত থেকে নতুন ভাটেরারচর গ্রামের পক্ষে চূড়ান্ত রায় আসে। রায়ের পর জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বন্দোবস্ত (লিজ) অনুযায়ী ওই চরে তারা দীর্ঘদিন ধরে শান্তিসৃঙ্খলা বজায় রেখে নিয়মিত চাষাবাদ করে আসছিলেন।
ভুক্তভোগী গ্রামবাসীর অভিযোগ, সোমবার সকালে বিনতপুর গ্রামের চিহ্নিত বাসিন্দা সেলেম ও ছেনু পার্শ্ববর্তী আলীরচর থেকে একদল ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে নৌকাযোগে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে চরের সীমানায় প্রবেশ করে। তারা শুধু চর দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং নতুন ভাটেরারচর গ্রামে ঢুকে ব্যাপক লুটপাট ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় আশর আলীর দোকানসহ গ্রামের অন্তত ছয়টি বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানান।
জমি হাতছাড়া ও অতর্কিত হামলার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভাটেরারচর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য শুক্কুর ভূঁইয়া বলেন, "প্রায় ২০ বছর আগে এ চর নিয়ে মামলা হয়েছিল। রায় আমাদের পক্ষে আসার পর সরকার আমাদের লিজ দেয়। সেই অনুযায়ী আমাদের গ্রামের লোকজন চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। আজ মেঘনা উপজেলার লোকজন এসে আমাদের গ্রামে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুর করেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।"
এ দিকে হামলার মূল অভিযুক্ত বিনতপুর গ্রামের সেলেম ও ছেনুর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে তিতাস থানার এসআই মাহমুদুল জানান, "খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। পরে মেঘনা থানা পুলিশ এসে তাদের লোকজন নিয়ে গেলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।"
যৌথ অভিযানের বিষয়ে মেঘনা থানার এসআই আক্তারুজ্জামান বলেন, "খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিতাস থানা পুলিশ ও আমরা যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি এবং মেঘনার লোকজনকে সরিয়ে নিয়ে যাই।"
আহতদের শারীরিক অবস্থার বিবরণ দিয়ে মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তানভীর লতিফ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "প্রায় ৩০ জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। সবাই ইটের আঘাতে আহত ছিলেন। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।"