
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে কুমিরের হামলায় প্রাণ হারানো সাত বছরের শিশু ফাতেমার সূত্র ধরে সাড়ে তিন বছর পর সন্ধান মিলল তার নিখোঁজ মায়ের। অবশেষে সন্তান হারানোর তীব্র বেদনার মাঝেই মানসিক ভারসাম্যহীন মা ফজিলা বেগমকে (৪৭) তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন আনুষ্ঠানিকভাবে ফজিলা বেগমকে তাঁর স্বজনদের হাতে তুলে দেন। এই আবেগঘন মুহূর্তে ফজিলা বেগমের বৃদ্ধা মা হাজেরা খাতুন, দুই ভাই হারেজ আলী ও জুয়েল মিয়াসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মাজারের দিঘিতে কুমিরের কামড়ে শিশু ফাতেমার মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ও ছবি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নজরে আসে ফজিলা বেগমের পরিবারের। প্রকাশিত ছবিতে ফজিলা বেগমকে দেখেই চিনতে পারেন তাঁর স্বজনরা। এরপরই পরিবারের ৬ সদস্য গত বুধবার ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরখরিচা গ্রাম থেকে বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে পৌঁছান।
মেয়ের সন্ধান পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফজিলা বেগমের মা হাজেরা খাতুন বলেন, "প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে আমার মেয়ে ফজিলা তার ছোট মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। তখন ফাতেমার বয়স ছিল তিন থেকে চার বছর। ফাতেমা পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল। বর্তমানে দুই ভাই ও দুই বোন জীবিত আছে। তাদের বাবা মমরুজ আলী রিকশা চালানোর পাশাপাশি কৃষিকাজ করেন। মেয়েকে ফিরে পেয়ে আমরা সবাই আনন্দিত, তবে ফাতেমার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে।"
একই অনুভূতি প্রকাশ করে ফজিলা বেগমের ছোট ভাই মোহাম্মদ জুয়েল মিয়া বলেন, "তিন বছরের বেশি সময় আগে আমার বোন হারিয়ে গিয়েছিল। আজ তাকে ফিরে পেয়ে আমরা আনন্দিত। তবে ভাগ্নি ফাতেমার মৃত্যুর কথা মনে হলে খুব খারাপ লাগে।"
মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ না থাকায় ফজিলা বেগম নিজের নিখোঁজ থাকার দিনগুলোর বিষয়ে গুছিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। তবে সন্তান হারানোর তীব্র শোকে আচ্ছন্ন হয়ে তিনি বারবার একটাই আকুতি ঝরে পড়ছে তাঁর কণ্ঠে, ‘আমি আমার মেয়েকে ছেড়ে যাব না।’
হস্তান্তর প্রক্রিয়ার বিষয়ে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, "ফজিলা বেগমের পরিবারের সদস্যরা সকালে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তা, বাগেরহাট সদর মডেল থানার প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে তাকে পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে।"
উল্লেখ্য, গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে খানজাহান আলী মাজার দিঘির পূর্ব পাশের ঘাটে মায়ের সঙ্গে গোসল করতে নেমেছিল ৭ বছরের শিশু ফাতেমা। ওই সময় হঠাৎ একটি বিশাল কুমির তাকে টেনে গভীর পানিতে নিয়ে যায়। দীর্ঘ তল্লাশির পর মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে দিঘির পানি থেকে ফাতেমার নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।