
দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছরে বিভিন্ন কার্যক্রম ও উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। শিক্ষার্থীদের আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, নারী শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা, গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেওয়া পদক্ষেপের তথ্য এতে তুলে ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ডাকসু ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক বছরের কার্যক্রম ও জবাবদিহি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম।
সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর পুরো কার্যক্রমের অডিট প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তবে উপস্থাপিত প্রেজেন্টেশনে বছরজুড়ে কয়েকটি কার্যক্রমে ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রেজেন্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, ছারপোকা দমনে ব্যয় হয়েছে ৩২ লাখ টাকা। শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নে খরচ হয়েছে ৩ কোটি টাকা।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কারে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক জিমনেসিয়াম নির্মাণে ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা জানানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হল সংস্কারের জন্য ৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা আদায়ের কথাও প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ডাকসুর পক্ষ থেকে একাধিক কার্যক্রমের কথা তুলে ধরা হলেও সেগুলোর বিস্তারিত ব্যয়ের হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ভিপি আবু সাদিক কায়েম জানিয়েছেন, ডাকসুর কার্যক্রমের অডিট প্রক্রিয়া এখনো চলছে। অডিট শেষ হওয়ার পর খরচের বিস্তারিত হিসাব কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকাশ করা হবে।
সমাজসেবা সম্পাদকের ৩৫ কোটি টাকার কাজের দাবি প্রসঙ্গে সাদিক কায়েম বলেন, ডাকসুর করা কাজের পরিমাণ ৩৫ কোটি টাকার চেয়েও বেশি। তবে প্রশাসনের বাধার কারণে অনেক কাজই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
বাজেট না পাওয়ার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে সাদিক কায়েম অভিযোগ করেন, ডাকসুর জন্য নির্ধারিত বাজেট এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘ডাকসুর জন্য নির্ধারিত বাজেট এখন পর্যন্ত প্রশাসন দেয়নি। পুরো সময় জুড়ে প্রশাসন বিমাতার মতো আচরণ করেছে।’
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শত ধরনের অসহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও এক বছরে আবাসন, পরিবহন, হলের খাবারের মান, স্বাস্থ্য ও গবেষণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ডাকসুর কমিটিগুলো এক হাজারের বেশি কাজ করেছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষক মূল্যায়নে প্রশাসনিক বিলম্বের অভিযোগ
শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গেও কথা বলেন ডাকসু ভিপি। তার ভাষ্য, শিক্ষক মূল্যায়নের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট একাডেমিক প্রক্রিয়ায় উত্থাপন করা হলেও প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ডাকসু নিজস্ব উদ্যোগে ‘DU Teachers’ Evaluation’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করে বলে জানান তিনি।
দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণা
ডাকসুর কার্যবিবরণী অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালনা প্রশিক্ষণ, হলভিত্তিক প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং বিনামূল্যে স্পোকেন ইংলিশ কোর্সের আয়োজন রয়েছে।
গবেষণার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে গবেষণা বিষয়ে কর্মশালা, গবেষণা প্রস্তাবনা তৈরির প্রশিক্ষণ, বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে সেশন এবং শিক্ষা এক্সপোর আয়োজন রয়েছে।
পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সেবা
পরিবহন খাতেও কয়েকটি নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ডাকসু।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রুটে সন্ধ্যার ট্রিপ, নারী হলগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য বাস এবং সাপ্তাহিক ঢাকা-কুমিল্লা বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিভিন্ন রুট বাড়ানোর জন্য নেওয়া উদ্যোগগুলোর তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
বাস্তবায়িত হয়নি যেসব প্রকল্প
এক বছরের কার্যক্রমের বিবরণ নিয়ে ‘খতিয়ান’ নামে একটি বইও প্রকাশ করেছে ডাকসু। বইটির একটি বড় অংশে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি অথবা কোনো না কোনো কারণে আটকে রয়েছে।
ডাকসুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিটি বিভাগের সহযোগিতায় কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, সার্টিফিকেশন সহায়তা, ইনোভেশন হাব এবং চাকরি মেলাসহ ছয়টি উদ্যোগ এখনো আটকে রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাঠ সংস্কার ও ডিজিটাল সেবা চালু, হলগুলোতে ভর্তুকি মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা, ডাকসু ক্যান্টিন সংস্কার, পুকুরপাড় সৌন্দর্যায়ন, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও আলোকসজ্জার মতো কয়েকটি উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।
এসব প্রকল্পের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগও রয়েছে।
আরও যেসব উদ্যোগ আটকে আছে
কাজী মোতাহার হোসেন ভবনের ক্যান্টিন, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিন স্থাপন, মোবাইল টয়লেট, নতুন যানবাহন সংগ্রহ এবং বিভিন্ন হলের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ আরও কয়েকটি উদ্যোগ আটকে থাকার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুদান বিতরণ, নারী শিক্ষার্থীদের জিমনেসিয়াম চালু এবং কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংস্কারের বিষয়েও ‘খতিয়ান’ বইয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।