
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে করদাতা ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ না বাড়িয়ে কিছু ক্ষেত্রে কর কমানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সুসংহত ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, এবারের বাজেট এমন এক সময়ে প্রণয়ন করা হয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতির সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এর প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও পড়ছে।
তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক অভিঘাত। ফলে বাজেটের নীতি ও কৌশলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়ার প্রত্যাশা ছিল।”
তবে বাজেটে করের বোঝা না বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের বিদ্যমান কর কাঠামো এমনিতেই জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে করের চাপ তুলনামূলক বেশি। এই বাস্তবতায় নতুন করে করহার বৃদ্ধি না করে বরং কিছু ক্ষেত্রে কর কমানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তিদায়ক।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, আমদানি পর্যায়ে শুল্ক, অগ্রিম কর ও উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব বাজারে পণ্যের মূল্য হ্রাসে সহায়ক হতে পারে। তবে এ সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
তার ভাষায়, “সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে যদি অযৌক্তিকভাবে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে কর কমানোর সুফল সাধারণ ভোক্তারা পাবেন না।”
তিনি আরও বলেন, করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক পদক্ষেপ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানোর সুযোগ ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাজেটের আকার ও ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তার মতে, প্রায় ১৯ শতাংশ বড় বাজেট অর্থনীতিতে সম্প্রসারণমূলক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো প্রয়োজন হলেও ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব ছিল।
তিনি সতর্ক করে বলেন, উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বাজারে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
মাসরুর রিয়াজের মতে, করের বোঝা না বাড়ানো, কিছু ক্ষেত্রে কর হ্রাস এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে মূল্যস্ফীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি সরাসরি কমিয়ে আনতে হলে শুধু করনীতি নয়, মুদ্রানীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার মধ্যেও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে জনস্বস্তির কিছু উদ্যোগ থাকলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে থাকবে।