
বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল ও স্মরণীয় এক দিন আজ—ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো মানুষের সমাবেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যা বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে চূড়ান্ত পথে এগিয়ে দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি রচনা করে।
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকে বাঙালিরা বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রাম চালিয়ে আসছিল। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ৬ দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয়তাবাদী চেতনা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করায় পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালির দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেন এবং ঘোষণা দেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
সেদিন ঢাকায় ছিল মানুষের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ ছুটে আসেন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য। স্লোগান ও মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো রাজধানী। ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধু দেশবাসীর জন্য সাত দফা নির্দেশনা দেন। তিনি অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রতিটি ঘরকে দুর্গে পরিণত করে শত্রুর মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে বলেন। এই ভাষণ পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অসীম অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
ভাষণটি প্রচার নিয়েও তৈরি হয়েছিল উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বেতারকে সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি দেয়নি। এর প্রতিবাদে বাঙালি কর্মচারীরা কাজ বন্ধ করে দিলে বিকেল থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্র কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এদিকে সারা দেশে মানুষ রেডিওর সামনে অপেক্ষা করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে কর্তৃপক্ষ ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচারের অনুমতি দিলে বেতার সম্প্রচার পুনরায় শুরু হয়।
বিশ্ব ইতিহাসেও এই ভাষণ বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ আন্তর্জাতিক রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মাধ্যমে এটি বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়—যা বাংলাদেশের জন্য প্রথম এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।