
রাজস্ব প্রশাসনকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও তথ্যনির্ভর কাঠামোয় রূপান্তরের লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য নতুন সংস্কার রোডম্যাপ তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির সুপারিশ অনুযায়ী, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসসহ করদাতার সব ধরনের তথ্যকে একটি একক করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরের (Single Taxpayer Identification Number) আওতায় আনতে হবে। এতে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সব কর-সংক্রান্ত তথ্য একটি প্ল্যাটফর্মেই পাওয়া যাবে এবং কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের নেতৃত্বে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের বৈঠকে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে আইএমএফ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে সফররত প্রতিনিধি দল রাজস্ব আহরণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করছে।
করদাতার সব তথ্য থাকবে এক প্ল্যাটফর্মে
বর্তমানে দেশে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য ইলেকট্রনিক ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ই-টিআইএন) এবং ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের জন্য বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) ব্যবহার করা হয়। ফলে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য পৃথক পৃথক ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকে। এতে করদাতার সামগ্রিক আর্থিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আইএমএফের প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি একক শনাক্তকরণ নম্বর চালু হলে সেই নম্বরের আওতায় করদাতার আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট রিটার্ন, আমদানি-রপ্তানির তথ্য, উৎসে কর কর্তন, কাস্টমস-সংক্রান্ত তথ্য, ব্যাংকিং লেনদেন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আর্থিক তথ্য একসঙ্গে দেখা ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এতে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা আরও কার্যকর হবে এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়বে।
বিচ্ছিন্ন তথ্যভাণ্ডারকে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছে আইএমএফ
বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিরা বলেন, এনবিআরের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার একটি হলো আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের তথ্য আলাদা আলাদা ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকা। ফলে একই করদাতার পূর্ণাঙ্গ আর্থিক চিত্র পাওয়া যায় না।
তাদের মতে, সমন্বিত করদাতা পরিচয় ব্যবস্থা চালু হলে তথ্য যাচাই, কর ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরীক্ষা নির্বাচন এবং রাজস্ব আহরণের পুরো প্রক্রিয়া আরও কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। একই সঙ্গে করদাতাদেরও একাধিক নম্বর ব্যবহার করতে হবে না; একটি পরিচয় নম্বর দিয়েই সব ধরনের কর-সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
অটোমেশনে জোর, যুক্ত হবে সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য
শুধু একক করদাতা নম্বর নয়, রাজস্ব প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ।
সংস্থাটি এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি), বাংলাদেশ ব্যাংক, ভূমি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ দপ্তর, কাস্টমস এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযুক্ত করার সুপারিশ করেছে।
এ ছাড়া অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল, ই-পেমেন্ট, উৎসে কর কর্তনের তথ্য, কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা পুরোপুরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশ্বের বহু দেশেই চালু রয়েছে একই ব্যবস্থা
আইএমএফ জানিয়েছে, বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে একক করদাতা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা কার্যকর করেছে। ভারতের পার্মানেন্ট অ্যাকাউন্ট নম্বর (পিএএন), নেপালের পিএএন, সিঙ্গাপুরের ইউনিক এন্টিটি নম্বর (ইউইএন), অস্ট্রেলিয়ার অস্ট্রেলিয়ান বিজনেস নম্বর (এবিএন) এবং নিউজিল্যান্ডের আইআরডি নম্বর একই ধরনের সমন্বিত করদাতা পরিচয় ব্যবস্থার উদাহরণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে কর প্রশাসনের তথ্য সমন্বয় সহজ হবে, কর ফাঁকির সুযোগ কমবে এবং করদাতারাও দ্রুত ও সহজে সরকারি সেবা পাবেন।
সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে মিল রয়েছে আগের সুপারিশের
আইএমএফের চলমান সংস্কার কর্মসূচিতেও কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, বিচ্ছিন্ন করদাতা নিবন্ধন একীভূত করা, তথ্য সমন্বয় এবং ইলেকট্রনিক কর ব্যবস্থাপনা চালুর বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটি মনে করে, করদাতাদের একক পরিচয় নিশ্চিত করা হলে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা এবং তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
এনবিআরের প্রস্তুতি কী
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশলের আওতায় অটোমেশন, তথ্য সমন্বয় এবং করদাতা সেবাকে পুরোপুরি ডিজিটাল করার কাজ ইতোমধ্যে চলছে। তবে বর্তমান অবকাঠামো ও তথ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে আয়কর ও ভ্যাটের পৃথক পরিচয় নম্বর তাৎক্ষণিকভাবে একীভূত করা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, প্রথমে করদাতা তথ্যভাণ্ডারের সমন্বয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে। এরপর ধাপে ধাপে একক করদাতা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
বর্তমানে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করছে। সংস্থাটি সরকারের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।