
খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোরতার বদলে ঋণগ্রহীতাদের জন্য একের পর এক ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর মেয়াদে পুনঃতপশিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিশেষ নীতি সহায়তা পাওয়া ঋণেও এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে। এমনকি বিশেষ সুবিধা নেওয়া ঋণে আবারও গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে চলতি সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ সুবিধার জন্য আবেদন করা যাবে। এ বিষয়ে গতকাল সোমবার ব্যাংকগুলোতে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
বিশেষ সুবিধায় খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিল বা পুনর্গঠনের জন্য গত বছরের জানুয়ারিতে একটি কমিটি গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই কমিটির কাছে প্রায় এক হাজার ২০০ আবেদন জমা পড়ে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন না করে কমিটির মাধ্যমে এভাবে সুবিধা দেওয়ায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। এরপর গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর একটি সার্কুলার জারি করে গত বছরের জুন পর্যন্ত খেলাপি হওয়া ঋণে বিশেষ পুনঃতপশিল সুবিধা নিতে আবেদন করতে বলা হয়। পরে গত বছরের ২৪ নভেম্বর আরেকটি সার্কুলারের মাধ্যমে আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ নভেম্বর করা হয়। গত মে মাসে আবার সময় বাড়িয়ে জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবার চতুর্থ দফায় আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হলো।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, নীতি সহায়তা-সংক্রান্ত বাছাই কমিটির সুপারিশ কিংবা গত বছর জারি করা এ সংক্রান্ত সার্কুলারের আওতায় ইতোমধ্যে সুবিধা নেওয়া ঋণগ্রহীতারাও নতুন করে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন করা ঋণের স্থিতি এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর মেয়াদে পুনঃতপশিলের সুবিধা দেওয়া যাবে।
যেসব ঋণ এখনো খেলাপি হয়নি, সেসব ঋণের ক্ষেত্রেও বিশেষ পুনঃতপশিল সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অবশিষ্ট মেয়াদের ৫০ শতাংশের সঙ্গে আরও চার বছর যোগ করে মেয়াদ নির্ধারণ করে ঋণ পুনর্গঠন করা যাবে। ইতোমধ্যে নীতি সহায়তা পাওয়া কোনো ঋণগ্রহীতার ঋণস্থিতি এক হাজার কোটি টাকার বেশি হলে তিনিও ১৫ বছর মেয়াদ এবং দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডের সুবিধা নিতে পারবেন। এর আগে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড নিয়ে সুবিধা নেওয়া গ্রহীতার ক্ষেত্রেও আরও মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। এই সার্কুলারের আওতায় করা সব আবেদন চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।
নিয়মিত ঋণে পুনঃতপশিল সুবিধার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বলেন, কেউ হয়তো আট বছর মেয়াদে ঋণ নিয়ে এরই মধ্যে দুই বছর পার করেছেন। এখন অবশিষ্ট ছয় বছরের সঙ্গে তিন বছর এবং অতিরিক্ত চার বছর যোগ করে মোট ১৩ বছরের জন্য ঋণটি পুনঃতপশিল করা যাবে। আর এক হাজার কোটি টাকার কম ঋণস্থিতির ক্ষেত্রে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পুনর্গঠন করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে নীতি সহায়তাসংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নীতি সহায়তা পাওয়ার জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে নতুন আবেদন করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ আদায়ে জোর দেওয়ার পরিবর্তে এভাবে একের পর এক ঢালাও সুবিধা দিয়ে আবার আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করার অজুহাত দেখানোর নতুন সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডের অর্থ হলো, যার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা রয়েছে, তিনিও আর ঋণ পরিশোধ করবেন না। এভাবে ঢালাও সুবিধা না দিয়ে কেস টু কেস ভিত্তিতে প্রকৃত সমস্যাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দেওয়া হলে সেটিই ভালো হতো।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিনের সমস্যা। গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণের তুলনায় কম দেখানোর প্রবণতা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাওয়ার পর এর পরিমাণ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ২০২৪ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের মোট ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। তবে বিশেষ নীতি সহায়তা চালুর পর মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নেমে আসে। সেখান থেকে আবার ৩১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা বেড়ে গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এটি মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।