
ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও সৌদি আরবে একের পর এক হামলার প্রেক্ষাপটে রিয়াদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে তুরস্ক। তবে সরাসরি ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়ানোর বদলে যৌথ সামরিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তার মধ্যেই আঙ্কারার ভূমিকা সীমিত রাখার ইঙ্গিত মিলেছে।
গত আগস্টে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় এ সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা রয়েছে। তবে এর বাস্তবায়নে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে প্রতিরোধ সক্ষমতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রয়োজন হলে সামরিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে আঙ্কারার আপত্তি নেই।
মক্কা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে চুক্তির প্রথম কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠকেও এসব বিষয়ে অগ্রগতির কথা জানানো হয়।
এদিকে ইয়েমেনে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কৌশলগত বন্দর মোখা এবং বাব আল-মান্দেবের কাছে হানিশ ও পেরিম দ্বীপপুঞ্জে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে তাদের প্রভাব বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হুথি হামলাও বেড়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর রিয়াদকে লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথা সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর আগে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানো হয়।
হুথিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে তুরস্ক। ১৬ সেপ্টেম্বর তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মক্কাকে লক্ষ্য করে হুথিদের ড্রোন হামলারও নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। একই সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
তবে ইয়েমেনে সরাসরি তুর্কি সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে আঙ্কারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তুর্কি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সিরিয়ার সঙ্গে ইয়েমেনের পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে। সিরিয়ায় তুরস্কের সরাসরি স্থলসীমান্ত ও তুলনামূলক সহজ সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা থাকলেও ইয়েমেনে একই ধরনের সুবিধা নেই।
এর পরিবর্তে সৌদি আরবের ঘোষিত লোহিত সাগরভিত্তিক নৌ নিরাপত্তা উদ্যোগে তুরস্কের অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি থাকলেও হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে আঙ্কারা সতর্ক অবস্থানেই রয়েছে।
তুরস্কের অবস্থানের সঙ্গে মক্কা চুক্তির বৃহত্তর কাঠামোর বিষয়টিও যুক্ত। ৩১ আগস্টের যৌথ বিবৃতিতে তিন দেশ চুক্তির আওতায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও বাহিনীগুলোর সমন্বয় বাড়াতে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি মক্কা চুক্তির কার্যকারিতার প্রথম বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। তবে চুক্তিটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর সামরিক জোটে রূপ নেয়নি এবং এর যৌথ প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে সৌদি আরব হুথি হামলা মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কয়েকটি দেশের কাছ থেকেও সামরিক সহায়তা চাইছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রিয়াদের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে, মক্কা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে সহায়তার ক্ষেত্রে তুরস্কের বর্তমান অবস্থান সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে প্রবেশের চেয়ে সৌদির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তা জোরদারের দিকেই বেশি কেন্দ্রীভূত বলে সাম্প্রতিক বক্তব্য ও চুক্তির কাঠামো থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে।