
একশ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শেষের পথে। তবে যুদ্ধের পর যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা যুদ্ধ শুরুর সময়কার হিসাব-নিকাশের সঙ্গে অনেকটাই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তেহরানের ক্ষমতাকাঠামোকে দুর্বল করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘাতের পর ইরান বরং আরও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে পৌঁছেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, সংঘাতের মাধ্যমে ইরানকে কাঙ্ক্ষিতভাবে দুর্বল করা সম্ভব হয়নি। বরং দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তেহরান নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এসব দেশ এখন আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। অনেক দেশই ভবিষ্যতে একক জোটের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প কৌশল খোঁজার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন অনেক সামরিক সম্পদ ব্যবহার করতে হয়েছে, যেগুলো দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সহজ নয়। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোও ওয়াশিংটনের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছে।
সমঝোতার ফলে হরমুজ প্রণালী আবার উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা কমার আশা করা হচ্ছে।
কয়েক মাসের এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণহানি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং বাণিজ্যিক ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘ সময় হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়। এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে পড়ে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, আলোচনায় থাকা সমঝোতা এখনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নয়। দুই পক্ষের আলোচিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ বিবরণও প্রকাশ করা হয়নি। তবে এতে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা, যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ানো এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলো ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়গুলো এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা ছিল, দ্রুত অভিযান চালিয়ে তারা কৌশলগত সাফল্য অর্জন করতে পারবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তেহরানের নেতৃত্ব কাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত এলেও ইরান দ্রুত নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলে এবং সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোর যে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘ সংঘাতে টিকে থাকার ফলে দেশটির নেতৃত্ব আরও দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে। নতুন নেতৃত্বের একটি অংশ আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বলেও মনে করা হচ্ছে।
যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালীকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ইরান আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করে। পাশাপাশি আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মাধ্যমেও নিজেদের সক্ষমতার বার্তা দেয়।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল সরাসরি অংশীদার থাকলেও, পরবর্তী সমঝোতা আলোচনায় তাদের ভূমিকা সীমিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তেল আবিবে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন নিজ দেশেই রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। সমালোচকদের অভিযোগ, যুদ্ধ প্রত্যাশিত ফল না এনে উল্টো নতুন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, বর্তমান সমঝোতা সাময়িক স্বস্তি এনে দিতে পারে। তবে এটি যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক সমঝোতায় রূপ নেবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি। দুই দেশের মধ্যে আদর্শিক বিরোধ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
তবে যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র হলেও, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় তার প্রভাব ও আধিপত্য আগের মতো প্রশ্নাতীত নয়। আর এই যুদ্ধের পর ইরানও নিজেকে আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি।