
যুদ্ধভীতি, পর্দার আড়ালের কূটনীতি আর তীব্র অভ্যন্তরীণ মেরুকরণের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে ইরান। এমন এক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মাঝেই গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে ইরানের প্রতিটি বড় বড় শহরের প্রধান চত্বরগুলোতে প্রায় প্রতি রাতে জড়ো হচ্ছেন এক দল মানুষ। সরকারি সংবাদমাধ্যমে একে ‘স্বতঃস্ফূর্ত গণজোয়ার’ বলে প্রচার করা হলেও, স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে, এসব সমাবেশ আসলে দেশটির গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ফাটলকেই স্পষ্ট করে তুলছে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে তেহরানের রাজপথের এই বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। সমাবেশে অংশ নেওয়া মহসেন নামের এক তেহরানবাসী গণমাধ্যমটিকে বলেন, “অবশ্যই আমরা প্রতি রাতে বাইরে আসি। আমরা তাদের বোঝাতে চাই যে, আমরা এই মাটিতে কখনোই বিদেশিদের পা রাখতে দেব না।” প্রায় প্রতি রাতে ইরানি পতাকা হাতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা দখল করে রাখছেন এই বিক্ষোভকারীরা।
দেশজুড়ে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ শাটডাউন বা বন্ধ থাকার সময়েও এই সমাবেশগুলো অব্যাহত ছিল এবং পরবর্তীতে বিধিনিষেধ আংশিক তুলে নেওয়ার পরও তা থামেনি। সরকার যে এসব সমাবেশে সরাসরি মদদ দিচ্ছে, তা এখন ওপেন সিক্রেট। বিশেষ করে তেহরানের সমাবেশস্থলগুলোতে যাওয়ার রাস্তাগুলো পুলিশ আগে থেকেই ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রাখে। মঞ্চ এবং লাউডস্পিকার তৈরিতেও থাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।
তবে তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা হেসাম একে ভিন্ন চোখে দেখছেন। টেলিভিশনে বারবার এসব ফুটেজ দেখে বাস্তব অবস্থা বুঝতে তিনি নিজে কয়েকটি সমাবেশে গিয়েছিলেন। হেসাম জানান, “সেখানে আসা অধিকাংশ মানুষই আসলে সেই একই চত্বরের, যারা সাধারণত সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে অংশ নেয়। এদের বড় অংশই বাসিজ (Basij) সদস্য, কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠী বা রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) সমর্থক। এখন তারা প্রতি রাতে রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, আর সাধারণ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে যানজট ও তীব্র আওয়াজের ভোগান্তি।” হেসামের বিশ্বাস, সরকারবিরোধীদের যদি একইভাবে খোলা মাঠে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হতো, তবে লোকসমাগম এর চেয়ে বহুগুণ বেশি হতো।
হুসাইন নামের এক সমাবেশকারী অবশ্য এটিকে জাতীয় ও ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করেন। তিনি বলেন, “আমরা এখনো যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আছি। দেশের সুরক্ষায় অনেকে হাত-পা হারিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন। আমি অস্ত্র ধরতে পারি না বা ক্ষেপণাস্ত্র চালাতে জানি না, কিন্তু অন্তত মাঠে এসে তাদের সমর্থন তো জানাতে পারি।”
বিপরীতে, মধ্য তেহরানের ৬২ বছর বয়সী বাসিন্দা মাসুদ জানান, মাসের পর মাস চলা এই নৈশকালীন চিৎকার ও হট্টগোলে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্লান্ত। তার ভাষায়, “তারা আমাদের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। প্রতি রাতে একই দৃশ্য—লাউডস্পিকারের চিৎকার, স্লোগান আর রাস্তাঘাট বন্ধ।”
কূটনীতি বনাম কট্টরপন্থা: অভ্যন্তরীণ কোন্দল
এই ধারাবাহিক সমাবেশগুলো কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, বরং ইরানের খোদ কট্টরপন্থী (কনজারভেটিভ) শিবিরের ভেতরের তীব্র দ্বন্দ্বকেও উস্কে দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পর্দার আড়ালে চলমান আলোচনা বা নেগোসিয়েশন নিয়ে সরকারের ভেতরেই তৈরি হয়েছে দুটি পক্ষ।
গত ৯ এপ্রিল এক লিখিত বার্তায় ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি তার সমর্থকদের রাজপথে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা চলার মানে এই নয় যে রাজপথ ছেড়ে দিতে হবে। খামেনি লিখেছিলেন, “রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি একটি নতুন মহাকাব্য তৈরি করেছে। আলোচনা চলতে পারে, তবে মানুষের ভাবা উচিত নয় যে মাঠে থাকা আর প্রয়োজন নেই।” মূলত ওয়াশিংটনের সাথে গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা সচল রেখেই জনমনস্তত্ত্বে এক ধরনের চাপ বজায় রাখতে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
একই সুরে সুর মিলিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং ওয়াশিংটন টকের প্রধান মধ্যস্থতাকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। গত ১১ মার্চ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) তিনি লেখেন, “ইরানের প্রিয় জনগণ, রাস্তায় আপনাদের উপস্থিতি শত্রুকে বিভ্রান্ত করেছে। এই সাধারণ সৈনিকের তিনটি মাত্র অনুরোধ: রাস্তা, রাস্তা এবং রাস্তা।”
সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে গালিবাফের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানালেও, ইরানের অতি-কট্টরপন্থী দলগুলো (যারা নিজেদের 'হেজবুল্লাহ' বলে পরিচয় দেয়) যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো ধরনের আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। তারা কূটনীতির চেয়ে সামরিক সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর পক্ষে।
উদ্ভূত অভ্যন্তরীণ কোন্দল থামাতে গত ২৮ মে একটি বিশেষ বার্তা দেন মোজতবা খামেনি। সেখানে তিনি গালিবাফের প্রশংসা করার পাশাপাশি দল উপদলের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, “যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ঐক্য রক্ষা করা বেশি জরুরি। নিজেদের মতভেদকে সংঘাত ও বিভাজনে রূপ দেবেন না।” তেহরানের রাজনৈতিক মহল এই বার্তাকে সরাসরি সেই সব কট্টরপন্থীদের প্রতি এক ধরণের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছে, যারা কূটনীতি বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সামরিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অনড়।
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই