
দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে ভয়াবহ মাত্রায় ছড়িয়ে রয়েছে ভুয়া ও ডুপ্লিকেট আইএমইআই (IMEI) নম্বর। এনইআইআর (National Equipment Identity Register) চালুর পর উঠে আসা তথ্য বলছে, “1111111111111”, “0000000000000”, “9999999999999”—এ ধরনের সহজ ও অনুরূপ প্যাটার্নের লক্ষ লক্ষ আইএমইআই বর্তমানে চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে সক্রিয় রয়েছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর স্পষ্ট হয়েছে, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিম্নমানের নকল বা ক্লোন ফোন ব্যবহার করছেন। এসব ফোনে কখনোই রেডিয়েশন টেস্ট কিংবা Specific Absorption Rate (SAR) পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জনজীবনে অস্বস্তি তৈরি হয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। এসব ফোন সম্পূর্ণ বন্ধ না করে ‘গ্রে’ হিসেবে ট্যাগ করা হবে।
গত ১০ বছরের সামগ্রিক হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধুমাত্র একটি আইএমইআই নম্বর “99999999999999”-এর বিপরীতে পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৯১ লক্ষ ২২ হাজার ৫৩৪টি সংযোগ (Document ID + MSISDN + IMEI কম্বিনেশন)। স্মার্টফোনের পাশাপাশি এসব আইএমইআই বিভিন্ন আইওটি (IoT) ডিভাইসেও ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও অপারেটররা মোবাইল ফোন, সিম-সংযুক্ত ডিভাইস ও আইওটি ডিভাইসের আইএমইআই আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, সিসিটিভির মতো ডিভাইস একই আইএমইআই দিয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে পারে। তবে বৈধভাবে আমদানি করা আইওটি ডিভাইস আলাদাভাবে ট্যাগ করার কাজ শুরু হয়েছে।
শীর্ষ কয়েকটি আইএমইআই বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শুধু “440015202000” নম্বরটি ব্যবহার করছে প্রায় সাড়ে ১৯ লাখ ডিভাইস, যেগুলো ডুপ্লিকেট হিসেবে শনাক্ত। একইভাবে—
“35227301738634” নম্বরে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ,
“35275101952326” নম্বরে সোয়া ১৫ লাখ,
আর মাত্র এক ডিজিটের শূন্য “0” আইএমইআই ব্যবহার করছে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি ডিভাইস।
নেটওয়ার্কে এক লাখের বেশি ডিভাইস সচল রয়েছে—এমন ভুয়া ও ডুপ্লিকেট আইএমইআইয়ের তালিকা দেখলে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:
440015202000 – 1,949,088
35227301738634 – 1,758,848
35275101952326 – 1,523,571
0 – 586,331
35464802000025 – 539,648
35868800000015 – 532,867
86740002031661 – 463,017
86740002031662 – 413,814
13579024681122 – 276,907
35210801000230 – 213,789
15151515151515 – 210,037
35975900251493 – 194,782
35868800009385 – 190,393
35505002098451 – 168,560
35945478498188 – 158,556
35464802000000 – 150,546
35391902568013 – 147,065
35973800955340 – 127,184
35325905457468 – 126,596
35968800000015 – 124,440
35827311738634 – 114,781
35448501567207 – 114,671
86301402000005 – 106,314
35411208064429 – 103,281
সংশ্লিষ্ট মহল আগে থেকেই ধারণা করছিল ক্লোন ও নকল ফোনের বিস্তার রয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র যে এত গভীর ও ভয়াবহ, তা অনেকেরই অজানা ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট ডিজিটাল জালিয়াতির ৭৩ শতাংশই সংঘটিত হয় অনিবন্ধিত ডিভাইস ব্যবহার করে। অন্যদিকে বিটিআরসি ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সংঘটিত e-KYC জালিয়াতির ৮৫ শতাংশই ঘটেছে অবৈধ বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে। একই বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার ফোন চুরির রিপোর্ট হয়—যার বাইরেও আরও কয়েক লক্ষ চুরির ঘটনা রিপোর্ট হয়নি বলে ধারণা করা হয়। এসব ফোনের বেশির ভাগই আর উদ্ধার করা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে ‘আন-অফিশিয়াল নতুন ফোন’-এর নামে নকল ও ক্লোন ফোন বিক্রি করা একটি নজিরবিহীন প্রতারণা। এই চক্র দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে ডিজিটাল নিরাপত্তা, আর্থিক লেনদেন এবং ব্যক্তিগত তথ্য—সবকিছুই বড় ঝুঁকিতে পড়বে।