
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলনকে ‘অতি-আশাবাদী’ বলে আখ্যায়িত করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী সংস্থা ফিচ রেটিংস। সরকার যেখানে আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির আশা করছে, সেখানে ফিচের পূর্বাভাস মাত্র ৩.৫ শতাংশ। দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত, বেসরকারি খাতে দুর্বল ঋণ প্রবৃদ্ধি, নীতিগত দুর্বলতা এবং অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে প্রবৃদ্ধি এতটা কম হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১৬ জুন ২০২৬) প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বৈশ্বিক এই রেটিং এজেন্সি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, নতুন বাজেট এবং আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে এই মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে।
ফিচ রেটিংসের প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত মূল অর্থনৈতিক বিশ্লেষণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘোষিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সরকারের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। নতুন বাজেটে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০.২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে তা হবে ১৯৯৩ সালের পর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত।
তবে কর আহরণে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণ ১৯ শতাংশ বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি সমন্বয়-পূর্ব রাজস্বে (নমিনাল রেভিনিউ) ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা বাস্তবায়ন করাই হবে আগামী অর্থবছরের প্রধান আর্থিক চ্যালেঞ্জ।
উচ্চ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি ও বাজেট ঘাটতি
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে মোট বাজেটের ২৯.৭ শতাংশ এবং অবকাঠামো খাতে ১৮.৭ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফিচের মতে, এটি নবনির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন হলেও তা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করছে।
তবে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ব্যয় করার একটি প্রবণতা রয়েছে। বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলে এই কম ব্যয়ের প্রবণতাই মূলত আর্থিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে। ফিচ আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘাটতির পূর্বাভাস জিডিপির ৩.৬ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে, যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রারই অনুরূপ।
জ্বালানি ও রপ্তানি খাতের ইতিবাচক দিক
বাজেটে নেওয়া কিছু পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে ফিচ রেটিংস। তাদের মতে:
অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং এলএনজি (LNG) অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগগুলো মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে বড় সহায়তক হবে।
রেমিট্যান্সে ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বহাল রাখা এবং তৈরি পোশাক (RMG) খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণে শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা সম্প্রসারণের ঘোষণাকে ইতিবাচক বলছে সংস্থাটি।
অনাবাসীদের যন্ত্রপাতি ভাড়ার পেমেন্টে উৎসে কর হ্রাস এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) প্রকল্পের বিশেষ প্রণোদনা বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখবে।
আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা
আইএমএফের ঋণের বিষয়ে ফিচ উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি নতুন আইএমএফ কর্মসূচির জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। তবে আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া বর্তমান ঋণ-কর্মসূচির চূড়ান্ত পর্যালোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কম।
সর্বোপরি ফিচ জানিয়েছে, সরকারের সংস্কার কর্মসূচিগুলো কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির টেকসই উন্নতি।