
ভোলার মনপুরা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু মুছা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মো. মাইন উদ্দিনকে ঘিরে আদালতের আদেশ উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে ছমেদপুর বাংলাবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু সুফিয়ান ইউএনও আবু মুছার বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১ এপ্রিল আদালত ইউএনও কর্তৃক চার্জ হস্তান্তরের আদেশের ওপর স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) জারি করেন এবং সাত দিনের মধ্যে জবাব দাখিলের জন্য ইউএনওকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নির্দেশ দেন। বিবাদী পক্ষ আদালতে জবাব না দিয়ে মিস আপিল করে। মিস আপিলের শুনানির জন্য আদালত আগামী ৫ জুলাই তারিখ নির্ধারণ করেছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আদালতের স্থিতাবস্থা বহাল থাকা সত্ত্বেও বরখাস্তকৃত সহকারী প্রধান শিক্ষক মাইন উদ্দিনের পক্ষে ইউএনওর অবস্থান তার অনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে ইউএনও আবু মুছা ও অভিযুক্ত মাইন উদ্দিন নতুন অ্যাডহক কমিটি পুনর্গঠনসহ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল বিদ্যালয়ের বিদায়ী প্রধান শিক্ষকের সংবর্ধনা ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বণিক ঘটনার আকস্মিকতায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন পরে তিনি ঘটনার তদন্তে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে পৃথকভাবে দায়িত্ব দেন।
দুই কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনে ওই ঘটনার সঙ্গে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. মাইন উদ্দিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। অভিযোগ রয়েছে, অনুরূপ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে মো. মাইন উদ্দিন পূর্বেও পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেছেন।
মনপুরা সিভিল আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইউএনও আবু মুছা আকস্মিকভাবে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে কমিটির সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই সাময়িক বরখাস্তকৃত শিক্ষক মো. মাইন উদ্দিনকে স্বপদে বহাল এবং তার পক্ষে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব অর্পণের জন্য ৩ এপ্রিল পর্যন্ত সময়সীমা দিয়ে একটি নোটিশ প্রদান করেন। এতে কমিটির সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে তারা আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) জারি করেন।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু সুফিয়ান জানান, আদালতের আদেশ অমান্য করে মাইন উদ্দিনকে দিয়ে অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করাচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু মুছা। বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি পুনর্গঠন করা হচ্ছে, যেখানে সরকারের বিধিও মানা হচ্ছে না। বিধিমোতাবেক সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা (৯ম গ্রেড) ছাড়া সভাপতি হতে পারবেন না। সেখানে মিজানুর রহমান কেরানীগঞ্জ হাসপাতালের একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে তালিকার প্রথমে রাখা হয়েছে, যিনি ১১তম গ্রেডের কর্মরত। এছাড়া বিধিমোতাবেক কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিকেও সভাপতি করা যায় না। অথচ তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে মো. ফারুক নামের একজনকে রাখা হয়েছে, যিনি একটি বেসরকারি মাদ্রাসার শিক্ষক। আমি এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক, ভোলার কাছে অভিযোগ দিয়েছি। আশা করি তিনি বিষয়টি দেখবেন। আদালতের স্থিতাবস্থা বহাল থাকা অবস্থায় মাইন উদ্দিনের প্রত্যেকটি স্বাক্ষর অবৈধ। তার স্বাক্ষরে বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করা যায় না।
বিষয়টি জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক উপপরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, বেসরকারি স্কুলগুলো মূলত ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ছমেদপুর বাংলাবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি এ মুহূর্তে ইউএনও আবু মুছা রয়েছেন। আমাকে বিদ্যালয়ের ইএমআইএসের পাসওয়ার্ডের বিষয়ে ইউএনও ফোন করেছিলেন, তাই আমি পাসওয়ার্ড দিয়েছি। বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখছি।
অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও আবু মুছার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমার কার্যালয়ের আদেশের পর সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হলে আদালত স্থিতাবস্থা জারি করেছেন। তাহলে আমার আদেশই বহাল থাকে।” তার কার্যালয়ের আদেশের বিরুদ্ধে আদালত স্থিতাবস্থা দিয়েছেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি। আপিলের রায় না আসা পর্যন্ত এভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় কি না জানতে চাইলে তিনি এ প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দেননি।