
পানির অপর নাম জীবন, আর এবার তৃষ্ণা মেটানোর সেই জীবনদায়ী পানি সরাসরি সংগৃহীত হবে উন্মুক্ত বাতাস থেকে! বিজ্ঞানের এক অবিশ্বাস্য চমৎকারিত্বে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনের প্রকৌশলীরা তৈরি করেছেন এমন একটি বিশেষ জ্যাকেট, যা বাতাসে ভেসে বেড়ানো অদৃশ্য আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প শুষে নিয়ে তা সরাসরি পানের উপযোগী খাঁটি পানিতে রূপান্তর করতে পারে। যুগান্তকারী এই গবেষণার বিস্তারিত তথ্য বিখ্যাত বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশ করা হয়েছে।
উদ্ভাবক দলটির মতে, এই পোর্টেবল বা পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি আগামী দিনে পাহাড়ি অভিযাত্রী, দুর্গম এলাকায় কর্মরত সেনাসদস্য, মাঠপর্যায়ের কৃষিশ্রমিক এবং আপদকালীন জরুরি উদ্ধারকর্মীদের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যেসব ভৌগোলিক অঞ্চলে বা দুর্যোগের সময়ে সুপেয় পানির কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস থাকে না, সেখানে এটি পানির সংকট মেটাতে শতভাগ কার্যকর সাড়া দেবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই জ্যাকেটের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে এর কাপড়ে। বিজ্ঞানীদের তৈরি এই পোশাকের কাপড়টি মূলত প্রাকৃতিক উপাদান বা বায়োমাস থেকে উৎপাদিত এক বিশেষ ধরনের ‘হাইড্রোজেল’ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এই বিশেষ উপাদানটি বাতাস থেকে দ্রুত জলীয় বাষ্প শোষণ করে জ্যাকেটের ভেতরে থাকা একটি পৃথক সংগ্রহ ইউনিটে পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তীতে জ্যাকেটের সাথে থাকা সহজে ভাঁজযোগ্য একটি সংগ্রাহক অংশে সূর্যের আলোর উত্তাপে সেই আর্দ্রতা ঘনীভূত হয়ে তরল পানিতে পরিণত হয় এবং তা পানের জন্য জমা হতে থাকে।
গবেষণাগারের পরীক্ষায় দেখা গেছে, পারিপার্শ্বিক বাতাসের আর্দ্রতার পরিমাণের তারতম্যের ওপর ভিত্তি করে এই জ্যাকেটটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৯০০ মিলিলিটার পর্যন্ত বিশুদ্ধ সুপেয় পানি তৈরি করতে সক্ষম। গবেষকদের দাবি, বাজারে প্রচলিত বায়ুমণ্ডলীয় পানি সংগ্রহের অন্যান্য গতানুগতিক প্রযুক্তির তুলনায় টেক্সটাইলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই বস্ত্রভিত্তিক প্রযুক্তির কার্যকারিতা তিন থেকে প্রায় দশগুণ পর্যন্ত বেশি।
বিজ্ঞানীরা জানান, এতদিন পর্যন্ত বায়ুমণ্ডল থেকে পানি সংগ্রহের যত প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছিল, তার প্রায় সবগুলোই ছিল মূলত এক জায়গায় স্থির রাখা বড় যন্ত্র, সোলার প্যানেল কিংবা বিশেষ শোষণ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে নতুন এই প্রযুক্তিতে প্রথমবারের মতো সরাসরি কাপড়ের সুক্ষ্ম তন্তুর (ফাইবার) মধ্যেই পানির প্রাকৃতিক চলাচলের পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাতাসের জলীয় বাষ্প অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তরল রূপ ধারণ করে কাপড়ে জমা হতে পারে।
টেক্সাসের এই একই গবেষক দল বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার ওয়াটার’-এ তাদের আরেকটি সম্পূরক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা সৌরশক্তিচালিত সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পানি সংগ্রহ যন্ত্রের বিবরণ তুলে ধরেছেন, যা চরম শুষ্ক ও আধা-আর্দ্র উভয় ধরনের প্রতিকূল পরিবেশেই প্রতিদিন ১ দশমিক ৩ লিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদনের এক নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। উক্ত গবেষণায় দেখা গেছে, আর্দ্রতা সংগ্রহকারী প্রতি এক কেজি উপাদান ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ৪ দশমিক ৩ লিটার পানি উৎপাদন করা সম্ভব।
নতুন আবিষ্কৃত এই সৌরচালিত যন্ত্রটির কার্যকারিতা যাচাই করতে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর অত্যন্ত শুষ্ক চিহুয়াহুয়ান মরুভূমি এবং টেক্সাসের অস্টিন শহরে সফল মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা (ফিল্ড টেস্ট) চালানো হয়েছে।
প্রকৌশলীদের দৃঢ় বিশ্বাস, বায়ুমণ্ডল থেকে পানি সংগ্রহের এই সাশ্রয়ী ও বহনযোগ্য প্রযুক্তিগুলো উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার মতো তীব্র পানির সংকটে ভোগা অঞ্চলগুলোতে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে এই বিশেষ হাইড্রোফাইল প্রযুক্তি ব্যাকপ্যাক, ক্যাম্পিং তাবু এবং জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রের কাপড়েও বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত করা যেতে পারে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
সূত্র: ডিজিটাল ট্রেন্ডস