
দশ গোলের ব্যবধান শুধু স্কোরলাইনেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের মেয়েদের অসহায়ত্ব ছিল এতটাই প্রকট যে, ম্যাচের পরিসংখ্যানই যেন পুরো গল্প বলে দিয়েছে। গোলমুখে উত্তর কোরিয়ার ২১টি শট, বাংলাদেশের শূন্য। বল দখল ৭৩ শতাংশ বনাম ২৭ শতাংশ। শেষ পর্যন্ত স্কোরলাইন—উত্তর কোরিয়া ১০, বাংলাদেশ ০।
নাগাই স্টেডিয়ামে এশিয়ান গেমসের নারী ফুটবলের ‘এফ’ গ্রুপের ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি পরাজয় নয়, হয়ে উঠেছে নারী ফুটবলে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হারের সাক্ষী। এর আগে ২০১৩ সালে ঢাকায় থাইল্যান্ডের কাছে ০-৯ গোলে হার ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরাজয়।
গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে পুরো বিপর্যয় দেখেছেন মিলি আক্তার। একের পর এক উত্তর কোরিয়ার আক্রমণ এসেছে তার দিকে। অথচ রক্ষণভাগ থেকে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। পঞ্চম মিনিটেই জন রিয়ং জং গোল করে এগিয়ে দেন উত্তর কোরিয়াকে। পাঁচ মিনিট পর আবারও গোল করেন তিনি। ১২ মিনিটে হাং ইউ ইয়ংয়ের গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৩-০।
এরপরও আক্রমণের ধার কমেনি উত্তর কোরিয়ার। ১৮ ও ৩৫ মিনিটে চে আন ইয়ং করেন জোড়া গোল। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে কিম কিয়ং ইয়ংও দুবার জালে বল পাঠালে বিরতিতে ৭-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
বিরতির পরও কাটেনি দুঃস্বপ্ন। ৫১ মিনিটে রি সং আ এবং ৬০ মিনিটে বদলি জং কুম গোল করে ব্যবধান ৯-০ করেন। ৯০ মিনিটে হান জিন হংয়ের দশম গোল শুধু ম্যাচের শেষ গোলই নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হারের ব্যবধানও নিশ্চিত করে।
দুই দলের শক্তির পার্থক্য অবশ্য কাগজে-কলমেই স্পষ্ট ছিল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে উত্তর কোরিয়া ১১ নম্বরে, বাংলাদেশ ১০৭। গত মার্চে এশিয়ান কাপেও এই প্রতিপক্ষের কাছে ৫-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। এবার ব্যবধান বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
এর সঙ্গে যোগ হয় বাটলারের একাদশে বড় পরিবর্তন। অভিজ্ঞ ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা ও শামসুন্নাহার সিনিয়র ছিলেন না শুরুর একাদশে। তরুণদের ওপর আস্থা রেখে সাজানো দলটি শুরু থেকেই উত্তর কোরিয়ার গতি ও আক্রমণের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
তবে ম্যাচ শেষে পিটার বাটলারের বক্তব্যে আলোচনার কেন্দ্রে শুধু ১০ গোলের হার থাকেনি। আবারও সামনে এসেছে তার পুরোনো অভিযোগ—মাঠের বাইরের হস্তক্ষেপ।
দলের ভয়াবহ পারফরম্যান্সের দায় মাঠের ভেতরের জন্য নিতে রাজি বাটলার। তবে মাঠের বাইরে কী হচ্ছে, তার দায় নিতে চান না তিনি।
উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে হার নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বাটলার বলেন, ‘আজ আমরা আমাদের সব নীতির বাইরে গিয়ে খেলেছি, যা আমাকে হতাশ করেছে। দুঃখজনকভাবে আমরা বড় ব্যবধানে হেরেছি এবং এটাই আমাদের প্রাপ্য ছিল। তবে মাঠের ভেতরের সবকিছুর পুরো দায় আমি নিচ্ছি। মাঠের বাইরের দায় আমি নিচ্ছি না।’
কিন্তু সেই ‘মাঠের বাইরে’ কী হচ্ছে? এবারও বাটলার দলের ভেতরের বিভাজন ও তাকে ঘিরে মতবিরোধের অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি বলেন, ‘মাঠের বাইরে যা ঘটছে, তা নিয়ে কিছু সমস্যা রয়েছে। মাঠের বাইরে কী হচ্ছে, তা তো আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তরুণ খেলোয়াড় গড়ে তোলার নীতি বাস্তবায়ন করা সঠিক নাকি ভুল—এ নিয়ে হয়তো অনেকেরই মত রয়েছে। এমনকি নারী উইংয়ের প্রধানও আমার কাজের উন্নয়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পছন্দ করেন না। এটি আমাদের ভিন্ন এক আলোচনায় নিয়ে যায়।’
এখানেই থামেননি ইংলিশ কোচ। মাঝরাতে খেলোয়াড়দের ফোন করা কিংবা কনফারেন্স কলে যুক্ত করার মতো বিষয়ও সামনে এনেছেন তিনি। তার বক্তব্যের সারকথা—এ ধরনের পরিবেশে একটি দল গড়ে তোলা কঠিন।
দলের মধ্যে সিনিয়র ও তরুণ—দুটি গ্রুপ তৈরি হওয়ার কথাও বলেছেন বাটলার। অথচ উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে যে তরুণনির্ভর দল মাঠে নামিয়েছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের গতি ও শক্তির সামনে কার্যত ভেঙে পড়ে।
ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অবশ্য বেশি সময় পাচ্ছেন না বাটলার। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ কোরিয়া। তবে সেই ম্যাচ নিয়েও আশাবাদের চেয়ে সতর্কতাই বেশি তার কণ্ঠে।
বাটলার বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচটিও হয়তো আজ আপনারা যা দেখেছেন, তেমনই হতে যাচ্ছে। তবে আমাদের ফিরে যেতে হবে। দলে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে, পুনর্গঠন করতে হবে এবং দেখতে হবে এখান থেকে আমরা কীভাবে সামনে এগোতে পারি।’
উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৯০ মিনিটে বাংলাদেশের গোলমুখে একটি শটও পৌঁছায়নি। বিপরীতে প্রতিপক্ষ নিয়েছে ২১টি শট। স্কোরলাইনও ছিল সেই একতরফা লড়াইয়েরই প্রতিচ্ছবি।
দশ গোলের এই রাত বাংলাদেশের সামনে রেখে গেছে দুটি বড় প্রশ্ন। মাঠের প্রশ্ন হলো—এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো জায়গায় যেতে বাংলাদেশকে আর কতটা পথ পাড়ি দিতে হবে? আর মাঠের বাইরের প্রশ্ন—বাটলার যে হস্তক্ষেপ ও মতবিরোধের কথা বারবার বলছেন, তার সমাধান হবে কীভাবে?
উত্তর কোরিয়ার কাছে ০-১০ গোলের হার অন্তত প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা নির্মমভাবেই দিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।