
ফুটবলের মহোৎসব বিশ্বকাপ মানেই নতুন কোনো প্রযুক্তির সংযোজন কিংবা নিয়মের আধুনিকায়ন। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে প্রথম হলুদ ও লাল কার্ডের প্রবর্তন, ২০১৮ সালে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থার সংযোজন কিংবা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ইনজুরি টাইম বা অতিরিক্ত সময় নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার পর এবার ২০২৬ বিশ্বকাপেও আসতে চলেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। ফুটবলের চিরাচরিত রূপ বদলে দিতে এবার বিশ্বমঞ্চে যোগ হচ্ছে ৪টি সম্পূর্ণ নতুন নিয়ম।
বাধ্যতামূলক কুলিং ব্রেক বা পানি পানের বিরতি
অতীতে সাধারণত চরম গরমের মধ্যে ফুটবলারদের ক্লান্তি দূর করতে পানি পানের জন্য সাময়িক বিরতি দেওয়া হতো। তবে এবারের বিশ্বকাপে আবহাওয়া কেমন থাকবে তা আর বিবেচনা করা হবে না। কনকনে ঠান্ডা পরিবেশ কিংবা ছাদ ঢাকা (ইনডোর) স্টেডিয়াম হলেও প্রতি অর্ধেকের মাঝামাঝি সময়ে রেফারি বাধ্যতামূলকভাবে ৩ মিনিটের একটি বিরতি দেবেন।
এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে ফিফা জানিয়েছে, ‘কোনো আবহাওয়া বা তাপমাত্রার শর্ত থাকবে না। সব দলের জন্য সমান পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে সব ম্যাচেই রেফারি এই বিরতি দেবেন।’ তবে সমালোচকদের দাবি, এই নিয়মের ফলে একটি ম্যাচ মূলত চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে, যা আমেরিকার জনপ্রিয় খেলাগুলোর সমতুল্য। এর মাধ্যমে মার্কিন সম্প্রচারকারী চ্যানেলগুলো ম্যাচ চলাকালীন বাড়তি বিজ্ঞাপন প্রচারের বড় সুযোগ পাবে।
ভিএআর (VAR) ব্যবস্থার পরিধি বৃদ্ধি
ফুটবল ম্যাচে গোল, পেনাল্টি, সরাসরি লাল কার্ড প্রদান কিংবা ভুলবশত অন্য কোনো খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার মতো ‘স্পষ্ট ও বড় ভুল’ সংশোধনের উদ্দেশ্যে ভিএআর প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে এবারের বিশ্বকাপের আগে ফুটবলের নিয়মকানুন নির্ধারণী সংস্থা আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি) এর আওতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে কর্নার কিকের সিদ্ধান্ত ও দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেওয়ার বিষয়টিও ভিএআর-এর মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হবে। এমনকি কোনো কর্নার যদি সম্পূর্ণ ভুলভাবে দেওয়া হয়ে থাকে, তাও রিভিউ করতে পারবে ভিএআর। তবে এই রিভিউ প্রক্রিয়ার কারণে ম্যাচ যাতে কোনোভাবেই দীর্ঘায়িত না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখা হবে।
সময় অপচয় রুখতে কাউন্টডাউন ও জরিমানা
ম্যাচে ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নষ্ট করার প্রবণতা বন্ধ করতে এবার গোলকিক, থ্রো-ইন এবং খেলোয়াড় পরিবর্তনের (সাবস্টিটিউশন) ক্ষেত্রে ডিজিটাল কাউন্টডাউন ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। গোলরক্ষকদের জন্য বল ধরে রাখার ৮ সেকেন্ডের নিয়ম আগে থেকেই সচল ছিল; এবার থ্রো-ইন কিংবা গোলকিকের ক্ষেত্রে রেফারি চাইলে ৫ সেকেন্ডের একটি দৃশ্যমান কাউন্টডাউন চালু করতে পারবেন। এই নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হলে বলের মালিকানা প্রতিপক্ষ দলের কাছে চলে যাবে। অর্থাৎ গোলকিকের সময় নষ্ট করলে তা কর্নারে রূপ নিতে পারে, আর থ্রো-ইনের সময় ক্ষেপণ করলে থ্রো-ইনটি পাবে প্রতিপক্ষ দল।
পাশাপাশি, খেলোয়াড় বদলের ক্ষেত্রে বোর্ডে নম্বর প্রদর্শনের পর ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ছাড়তে হবে। কোনো খেলোয়াড় এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে তার পরিবর্তে বেঞ্চে থাকা বদলি ফুটবলার পরবর্তী স্টপেজের আগে মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন না। এছাড়া কোনো খেলোয়াড় চোটের কারণে মাঠের বাইরে গেলে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত ১ মিনিট মাঠের বাইরেই অবস্থান করতে হবে।
মুখ ঢেকে কথা বললেই দেখতে হবে লাল কার্ড
মাঠে প্রতিপক্ষ দলের কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা বা কথা বলার সময় যদি কেউ হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখেন, তবে তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখানোর কঠোর বিধান এনেছে ফিফা। গত মাসে সংস্থাটি এই নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।
এই কঠোর নিয়মের সূত্রপাত মূলত গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস লিগের একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে। সেই ম্যাচে বেনফিকার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে কথা বলার সময় মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ভিনিসিয়ুসের প্রতি বর্ণবাদী গালি বা মন্তব্য করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে প্রেস্তিয়ান্নি ‘বৈষম্যমূলক আচরণের’ দায়ে ছয় ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন।
নতুন এই নিয়মের বিষয়ে ফিফা আরও স্পষ্ট করেছে যে, রেফারির কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে কোনো ফুটবলার যদি মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান, তবে তাকেও লাল কার্ড দেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে বিশ্ব ফুটবল নিয়ামক সংস্থা ফিফা জানিয়েছে, ‘এই নতুন নিয়ম এমন কোনো দলীয় কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যিনি খেলোয়াড়দের মাঠ ছেড়ে যেতে উসকানি দেন। যে দল ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে, সাধারণভাবে সেই দল ম্যাচটি হারবে বলে গণ্য করা হবে।’