
ঢাকার মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। রাতের বেলায় একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কেন এভাবে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে এ ঘটনার সমালোচনা করছেন।
ঘটনাটি নিয়ে সরব হয়েছেন ডা. তাসনিম জারা। তিনি এ ঘটনায় সরকারের ভূমিকা ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে চারটি প্রশ্ন তুলেছেন।
৫০ বছর ধরে মা ও শিশুদের সেবা
ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তাসনিম জারা লিখেছেন, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫০ বছর ধরে মিরপুরের দরিদ্র মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। নামমাত্র খরচে তারা এসব সেবা দিয়ে থাকেন।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে তার কাজের বড় একটি অংশ মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হামলার পর কয়েকটি বিষয় বারবার তার মনে এসেছে।
নষ্ট হতে পারে টিকা, হারিয়েছে নথিপত্র
তাসনিম জারার প্রথম উদ্বেগ টিকা নিয়ে। তিনি জানান, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করলে টিকা নষ্ট হয়ে যায়। হামলার সময় ফ্রিজ থেকে বের হয়ে যাওয়া কিংবা মেঝেতে পড়ে থাকা টিকাগুলো আর কোনো শিশুকে দেওয়া সম্ভব হবে না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় টিকার রেজিস্টারও লুট হয়েছে। ওই রেজিস্টারে কোন শিশু কোন টিকা পেয়েছে এবং কোন টিকা এখনো বাকি রয়েছে, তার হিসাব থাকে। রেজিস্টার না থাকলে অনেক শিশুর পরবর্তী ডোজ বাদ পড়ে যেতে পারে এবং তাদের টিকা বাকি থাকার বিষয়টিও শনাক্ত করা কঠিন হবে।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, চলতি সপ্তাহেই ওই কেন্দ্রে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল।
তাসনিম জারা বলেন, এ বছর হামের সংক্রমণ নিয়ে যখন ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে, তখন টিকাদান শুরুর আগের রাতেই সেই টিকাদান কেন্দ্রটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন নেই, বিপাকে দরিদ্র গর্ভবতী নারীরা
হামলার পর কেন্দ্রটির দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে তাসনিম জারার প্রশ্ন, মিরপুর এলাকার যেসব গর্ভবতী মা বেসরকারি ক্লিনিকে অর্থ খরচ করে আলট্রাসনোগ্রাম করাতে পারেন না, তারা এখন কোথায় এই সেবা পাবেন?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েই সরকারের কাছে প্রথম প্রশ্ন তুলেছেন তাসনিম জারা।
তিনি বলেন, থানা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে প্রায় ২০০ মানুষ ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলেছে। ডিএমপি কমিশনারও বলেছেন, এটি আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার মধ্যে করার মতো ঘটনা নয়; বরং সময় নিয়ে কাজটি করা হয়েছে। তার ওপর কেন্দ্রের লোকজন পুলিশকে আগেই বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
এ অবস্থায় পুলিশ তখন কী করছিল—এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মানুষের নিরাপত্তার জন্য পুলিশকে ভরসা করলে তারা কীভাবে সেই আস্থা ধরে রাখবেন?
জায়গা দখলের চেষ্টা নিয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন
দ্বিতীয় প্রশ্নে তাসনিম জারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জায়গা দখলের চেষ্টা নিয়ে কথা বলেন।
তার দাবি, এর আগেও জায়গাটি দখলের চেষ্টা হয়েছিল, যদিও তখন তা সফল হয়নি। তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আবারও জায়গাটি দখলের চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো দল ক্ষমতায় এলে দখলদাররা কেন উৎসাহিত হয় এবং দলের কারা তাদের প্রশ্রয় দেয়। একই সঙ্গে দখলদারদের বিচারের আওতায় না আনলে সরকারের অন্য কোনো অর্জনেরই অর্থ থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঘটনাটি কি বিচ্ছিন্ন—তৃতীয় প্রশ্ন
মিরপুরের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তাসনিম জারা।
তিনি কুয়াকাটায় দোকান দখল, লালমনিরহাটে আদালতে বিচারাধীন জমি দখল এবং নারায়ণগঞ্জের বন্দরে পুলিশের সহযোগিতায় বাড়ি দখলের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন। এসব ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ এসেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
জয়পুরহাটে দলটির একজন নেতাকে বহিষ্কারের বিষয়টিকে ভালো পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করলেও তিনি বলেন, শুধু বহিষ্কার কোনোভাবেই বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
তার প্রশ্ন, দখলদারি বন্ধ করার বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সত্যিই উদ্যোগী কি না, নাকি শুধু বহিষ্কার ও বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে চান।
সরকারি টিকাদান কর্মসূচি
চতুর্থ প্রশ্নে তাসনিম জারা জানতে চেয়েছেন, এই হামলা শুধু একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, নাকি সরকারের টিকাদান কর্মসূচিতেও এর প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, হামলায় সরকারের ইপিআই টিকা এবং টিকার রেজিস্টার লুট হয়েছে। ফলে বিষয়টি কেবল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সরকারের নিজস্ব টিকাদান কর্মসূচিও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এখন মিরপুর এলাকার শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নেবে—সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। একই সঙ্গে কোন শিশুর কোন টিকা নেওয়া বাকি রয়েছে, সেই তথ্য পুনরায় শনাক্ত করার দায়িত্ব কার, তা নিয়েও সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন তাসনিম জারা।