
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ব্যক্তিগত ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মুখে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে দলীয় সদস্যপদ হারালেও তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা বলছেন, কেবল দল থেকে বহিষ্কার হওয়া বা নৈতিক স্খলনের অভিযোগ উঠলেই সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় না।
২২ জুলাই ২০২৬, বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলটির দাবি, সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, দল থেকে বহিষ্কার হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় না।
তিনি বলেন, ‘নৈতিক স্খলনজনিত কোনো বিষয় যদি সংসদের ইনকোয়ারি কমিটিতে প্রমাণিত হয়, তাহলে তার পদ যেতে পারে। এটার জন্যও সংসদীয় তদন্ত লাগবে।’
একই মত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক। তাঁর ভাষায়, ‘কিন্তু সংসদ সদস্য পদ হারাবে তখনই, যখন কেউ দলের বিপক্ষে সংসদে ভোট দেয় অথবা পদত্যাগ করে। এছাড়া নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে ফৌজদারি বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারও যদি দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড হয়, তখন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে এখানে একটা অস্পষ্টতা আছে। সব অপরাধের জন্য এটা হবে না, শুধু নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে হবে। এখন কোনটা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ, আর কোনটা না, সেটার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নাই। কোর্টের রায়েও এ নিয়ে কিছু আসে নাই।’
এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। শুরুতে তাঁর সমর্থকদের কেউ কেউ ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করলেও পরে কয়েকটি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান জানায়, ভিডিওগুলো এআই-নির্মিত নয়।
এরপর গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই তাঁদের বিয়ে হয়েছে।
তবে ওই বিয়ের কাবিননামার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কাবিননামায় নাম থাকা কাজী একটি গণমাধ্যমকে জানান, বিয়ে কোথায় হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি জানেন না। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, কাবিননামাটি পুরোনো তারিখ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে।
শাহদীন মালিকের মতে, ‘আইনগতভাবে কেউ যদি স্বামী-স্ত্রী না-ও হয়, তাহলে কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ক আইনের চোখে ফৌজদারি অপরাধ না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি প্রথম স্ত্রীর পারমিশন না নিয়ে অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করলেও সর্বোচ্চ শাস্তি হবে এক বছরের জেল। আইনের চোখে বিয়েটা কিন্তু তখনও বৈধ।’
একই বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘আইনে আছে, ১৮ বছরের নিচে হলে বিয়ে করা যায় না, তখন নিকাহ রেজিস্ট্রারও জবাবদিহির আওতায় আসবে। আর বিয়ের বাইরে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক করা সামাজিক বিষয়। কিন্তু যার সঙ্গে ঘুরছে, সে কখনও অভিযোগ করলে মামলা হয়ে যাবে।’
গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর এক মামাসহ কয়েকজন তাঁকে একটি কক্ষে জিম্মি করে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করেন। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং অর্থ দাবি করা হয়।
তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে, হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
এদিকে তাঁর প্রথম স্ত্রীও এক ভিডিওবার্তায় বলেন, ‘আমার স্বামী গাজী নজরুল ইসলামের সহিত মরিয়মের (দ্বিতীয় স্ত্রী) সাথে বিবাহ হয়েছে। যারা এটা নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এ থেকে বিরত না থাকলে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো।’
অন্যদিকে, ভিডিওতে দেখা যাওয়া তরুণীও দাবি করেন, ‘প্রথমত আমাদের বিয়ে কোনো গোপন বা অনৈতিক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের ১৭ জুন সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আমার বাবার বাসায় উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন।’
ভিডিও, বিয়ের দাবি, কাবিননামার অসংগতি এবং কাজীর বক্তব্যকে ঘিরে ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের বহিষ্কার বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো নতুন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।