
ইতিহাসে গাঁথা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুরোনো পরিচয় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে বর্তমান বিজিবির আগের নাম বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) এবং বাহিনীর সাবেক ইউনিফর্ম পুনর্বহাল করা হবে।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু হোটেলে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্য ও তাদের পরিবারের অংশগ্রহণে আয়োজিত ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুদৃঢ় আস্থা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে গঠিত সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক উপকমিটির উদ্যোগে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
তারেক রহমান আরও জানান, ভবিষ্যতে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে লক্ষ্য নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে ওই দিনটিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’, ‘সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবস’ অথবা ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “২০০৯ সালে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর পতিত পরাজিত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বিডিআর এর নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিল। এমনকি তাদের পোশাকের রং ও পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে। আমি আপনাদের সামনে একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করতে চাই। জনগণের রায় বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বিডিআর এর নাম পুনর্বহাল করা হবে।”
সাবেক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের দেওয়া সুপারিশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “বক্তব্য দেয়ার আগে সাবেক কয়জন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা আমাকে সেনাবাহিনী জন্য কিছু সুপারিশ তুলে দিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন, সেনা আইনের কিছু কিছু বিধিমালা পরিমার্জন বা সংস্কারসহ এসব সুপারিশ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। তবে এতোটুকু বলতে পারি আগামী ১২ ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণের রায়ে বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আপনাদের উপস্থাপিত এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সেনাবাহিনীর সাবেক এবং বর্তমান সদস্যদের সমন্বয়ে আমরা একটি কমিটি গঠন করব। সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দাবি-দাওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।”
সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “সেনাবাহিনী আমার কাছে বৃহত্তর পরিবার বলে মনে হয়। সেনানিবাসে আমার বেড়ে ওঠা। ছোট বেলায় আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি। আমি বড় হয়ে দেখেছি সেনাবাহিনীর প্রতি আমার মা মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার এক ধরনের নির্ভরতা ছিল, সম্মান ছিল। মা সব সময় মনে করতেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকা দরকার। সন্তান হিসেবে আমার পিতাকে নিয়ে যেমন আমি গর্ব করি, তেমনি বিশ্বাস করি একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীকে গর্বিত করেছিলেন।”
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করে তিনি বলেন, “শহীদ জিয়াকে নিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক জনগণ যেমন গর্বিত, তেমনি আমি, আমার পরিবার বিশ্বাস করে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীও তেমন গর্বিত। জনগণ দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য নির্ভরযোগ্য প্রহরী হিসেবে মনে করে। সেনাবাহিনীকে ভিন্ন কাজে সংযুক্ত করা হলে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় বলে মনে করি।”
দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “বিগত দেড় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং গৌরব সম্পর্কে সেনা কর্মকর্তা এবং সদস্যরা নিজেরা নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞেস করলে হয়তো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। তাঁবেদার এবং অপশক্তির কবলে পড়ার পর দেশের গণতন্ত্র শুধু হরণ হয়নি, একইসঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল। এমনকি পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাকান্ডের দিন সেনাবাহিনী যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেনি বা রাখতে দেয়া হয়নি।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সেনাবাহিনীর গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বদলে গৌরব অর্জন ও রক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, গৌরব কোনো রাজনৈতিক ঘোষণায় ফেরানো যায় না, এটি অর্জন ও ধারণের বিষয় এবং সেনাবাহিনীকেই নিজেদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় সচেতন থাকতে হবে।
রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও অবস্থান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে সেনাবাহিনীকে কখনোই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হবে না। অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীর সম্মান ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো কাজে বিএনপি যুক্ত হবে না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
তারেক রহমান আরও বলেন, সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে, তবে রাজনীতির সঙ্গে বিলীন হয়ে যাওয়া উচিত নয়। পেশাদারিত্ব যাতে কোনোভাবেই রাজনৈতিক আবরণে ঢাকা না পড়ে, সে বিষয়ে সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর। আরও বক্তব্য রাখেন মেজর (অব.) মিজানুর রহমান। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্নেল (অব.) হারুনুর রশিদ খান, মেজর (অব.) জামাল হয়দার এবং বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের সন্তান রাকিন আহমেদসহ অনেকে।