
একাত্তরের স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছিলেন, সেই প্রশ্নে আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল চট্টগ্রাম। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা জিয়াউর রহমান নয়, চট্টগ্রাম থেকেই সেই ঘোষণা দিয়েছিলেন এলডিপি চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। সোমবার চট্টগ্রাম নগরীর বন্দর কলেজ মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবময় কেন্দ্র। তার ভাষায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এখান থেকেই প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছিল। তিনি বলেন, “চট্টলাবাসীর এক গর্বিত সন্তান ড. কর্নেল অলি আহমদ সবার আগে ‘উই রিভল্ট’ বলে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি জিয়াউর রহমানকে হাতে ধরে সামনে এগিয়ে নিয়েছিলেন।”
জামায়াত আমির আরও বলেন, কর্নেল অলি নিজেই আক্ষেপ করে বলেছেন, “আমি লড়াই করেছি রণাঙ্গনে। জাতীয়তাবাদী দল গঠনে আমি ছিলাম জিয়াউর রহমানের পরে দ্বিতীয় ব্যক্তি।” এরপর তিনি কর্নেল অলির বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, “আমি এখন বিএনপিতে নেই। আমি থাকতে পারি না। কারণ এটি জিয়াউর রহমান সাহেবের বিএনপি নয়। এটি বেগম জিয়ারও বিএনপি নয়।”
সমাবেশে রাজনৈতিক সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তাদের ওপর প্রকাশ্য হামলা চালানো হয় এবং জিরো পয়েন্টে দিবালোকে ছয়জনকে হত্যা করা হয়। তার মতে, এখান থেকেই খুনের রাজনীতির সূচনা। তিনি বলেন, পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ যা করেছে, তার সাক্ষী বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ। তিনি দাবি করেন, জনগণ তাদের পাওনার একাংশ ইতিমধ্যে আদায় করেছে এবং বাংলাদেশ এখন মুক্ত হয়েছে। এরপর তিনি প্রশ্ন রাখেন, দেশকে পুরোপুরি মুক্ত দেখতে চান কি না। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে হলে ফ্যাসিবাদের চরিত্রের রাজনীতিকে চিরতরে লাল কার্ড দেখাতে হবে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর যে বার্তা দিয়েছিল, আজ একটি দল একই ধরনের বার্তা দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও ওই দলের নেতারা সাম্য, সম্মান ও ভালোবাসার পথে আসছেন না। তার অভিযোগ, তারা জামায়াতের নেতাকর্মী এবং মা-বোনদের লক্ষ্য করে হামলা ও হুমকি দিচ্ছে। তিনি বলেন, “তারা মা-বোনদের গায়ে হাত দেয়। হুমকি দেয় কাপড় খুলে ফেলবে।” এ ধরনের আচরণকে নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, “তোমার যদি পারিবারিক শিক্ষা না থাকে তাহলে তুমি মানুষ নও।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, এসবের প্রতিবাদ করায় তার আইডি হ্যাক করে তার নামে জঘন্য বিষয় ছড়ানো হয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত তা ইতিমধ্যে শনাক্ত হয়েছে।
সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান শেষে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনে ১১ দলীয় জোট মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন ডা. শফিকুর রহমান।
এদিকে সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি জানান, বিকেলে পৌরসদরের ডেবারপাড় মাঠে চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী আলাউদ্দিন সিকদারের সভাপতিত্বে আয়োজিত জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, “আজকে একটি দল বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। কিন্তু তাদের কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র সফল হবে না।” তিনি বলেন, দেশের মানুষ চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চায়। তার ঘোষণা ছিল, নির্বাচিত হলে তারা নিজেরা দুর্নীতি করবেন না এবং কাউকে করতেও দেবেন না। একই সঙ্গে চাঁদা দেওয়া বা চাঁদাবাজির সুযোগও থাকবে না। তিনি অভিযোগ করেন, জনসমর্থন হারিয়ে একটি দল নারীদের হেনস্তার পথ বেছে নিয়েছে। তিনি ভোট কেনার চেষ্টা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান। ওই জনসভায় আরও বক্তব্য দেন আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী, ডা. এ টি এম রেজাউল করিম, অধ্যক্ষ নুরুল আমিন, অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান, শাহাজান মঞ্জু ও মাওলানা নাসির উদ্দিন মনির।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, সোমবার কক্সবাজার পৌর শহরের বাহারছড়া মুক্তিযোদ্ধা মাঠে আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ২০১৮ বা ২০২৪ সালের মতো নয়। তার ভাষায়, “এ নির্বাচন ফ্যাসিবাদকে লাল কার্ড দেখানোর নির্বাচন। জুলাই যোদ্ধাদের প্রত্যাশা পূরণের নির্বাচন।” তিনি বলেন, ১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে সর্বত্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং “সবকিছু ক্ষমা করা হলেও জুলাই হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে।” জেলা জামায়াত আমির অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারির সভাপতিত্বে তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারের বিভিন্ন আসনে তথাকথিত হেভিওয়েট প্রার্থীরা তাদের প্রার্থীদের ভয় দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের দাঁড়িপাল্লায় রায় দিয়ে তাদের ওয়েট মাপবে জনগণ।”
তিনি ঘোষণা দেন, “১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন বাংলাদেশ পাবে দেশবাসী।” সরকার গঠনের সুযোগ পেলে নারীদের মাস্টার্স পর্যন্ত বিনা খরচে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি। তার মতে, ইনসাফের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠাই হবে তাদের মূল লক্ষ্য। নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলায় তার বিরুদ্ধে গোপনে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পেছনের লোকেরা পেছনে পড়ে থাকবে, আমরা ক্ষমতায় গেলে নারীদের মাথার ওপর করে রাখা হবে।” তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের দাবি ছিল কাজ, বেকার ভাতা নয়। শিক্ষিত যুবকদের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার অঙ্গীকারও করেন তিনি। কক্সবাজার কেন সিঙ্গাপুর বা সাংহাই হতে পারেনি, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কক্সবাজারের চারটি আসন ১১ দলীয় জোটকে দিলে একটি সুশৃঙ্খল পর্যটন জেলা উপহার দেওয়া হবে।
সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া কক্সবাজারের সমাবেশে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা দলে দলে যোগ দেন। ব্যানার, ফেস্টুন ও স্লোগানে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, জেলা সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম, কক্সবাজার-৩ আসনের প্রার্থী শহিদুল আলম বাহাদুর, কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক ও কক্সবাজার-৪ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারি। ওই দিন তিনি কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে মোট পাঁচটি জনসভায় বক্তব্য দেন এবং আগামী বুধবার টাঙ্গাইলে যাওয়ার কথা রয়েছে।
লোহাগাড়া প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া হাই স্কুল মাঠে আয়োজিত আরেক জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, জনগণ দায়িত্ব দিলে তারা শাসক নয়, সেবক হিসেবে দেশ পরিচালনা করবেন। দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে বক্তব্য দেন এলডিপি চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনম শামশুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-১২ আসনের প্রার্থী ডা. ফরিদুল আলম, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের প্রার্থী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান, বান্দরবান আসনের প্রার্থী আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন, খেলাফত মজলিসের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ইমরান ইসলামাবাদি এবং ডাকসুর সাবেক জিএস এস এম ফরহাদ। সমাবেশ শেষে জামায়াত আমির জোটের দাঁড়িপাল্লা, শাপলাকলি ও ছাতা প্রতীকের প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দেন।