
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের পর জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের (জেজিটিডিএসএল) ৭৮৬ কোটি টাকা বকেয়া আদায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টার এক বিশেষ সহকারীর চাপ এবং তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে বিপুল পরিমাণ বকেয়া রেখেই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান লাফার্জহোলসিমের সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ চুক্তি নবায়ন করতে বাধ্য হয় কোম্পানিটি। এরপর থেকে আইনি জটিলতায় আটকে আছে বকেয়া আদায়ের প্রক্রিয়া।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বকেয়া আদায়ে আদালতের রায় পাওয়ার পর লাফার্জহোলসিমের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তুতি নিয়েছিল জালালাবাদ গ্যাস। তবে তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা ড. ফাওজুল কবীর খানের হস্তক্ষেপে সেই উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। এ ক্ষেত্রে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার এক বিশেষ সহকারীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর বকেয়া গ্যাস বিল পরিশোধে লাফার্জহোলসিমকে ২৪ ঘণ্টার নোটিশ দেয় জালালাবাদ গ্যাস। নোটিশ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সময় চান। আলোচনার পর সাত দিন সময় দেওয়া হলেও বকেয়া পরিশোধ না করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় লাফার্জহোলসিম। পরে হাইকোর্ট গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের বিষয়ে স্থিতাবস্থা জারি করেন।
ওই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করে জালালাবাদ গ্যাস। ১১ ডিসেম্বর বিচারপতি খিজির হায়াৎ খান শুনানি শেষে স্থিতাবস্থার আদেশ বাতিল করেন। এতে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে আইনি বাধা দূর হয়। এরপরই লাফার্জহোলসিমের সিমেন্ট কারখানার সংযোগ বিচ্ছিন্নের প্রস্তুতি নেয় জালালাবাদ গ্যাস। তবে ওই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে তাৎক্ষণিকভাবে চেম্বার আদালতে যায় লাফার্জহোলসিম।
জালালাবাদ গ্যাসের পক্ষে দেওয়া আদেশ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চেম্বার আদালতে স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আপিল করা হলেও ১১ মাসেও মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি। এ অবস্থায় বকেয়া আদায়ের বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
জেজিটিডিএসএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, মামলাটি বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে শিল্পকারখানায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর থেকেই বিল পরিশোধ নিয়ে জালালাবাদ গ্যাস ও লাফার্জহোলসিমের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও বর্ধিত দর অনুযায়ী বিল দিতে অস্বীকৃতি জানায় প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দাবি, চুক্তিতে নির্ধারিত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৮ টাকা ৩১ পয়সার বেশি দেওয়া সম্ভব নয়।
ওই সময়ে দেশের অন্যান্য সিমেন্ট কারখানা প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের জন্য ৩০ টাকা হারে বিল পরিশোধ করলেও লাফার্জহোলসিম আংশিকভাবে প্রায় ১১ টাকা দরে বিল দিয়ে আসছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দর অনুযায়ী বিল হিসাব করে জালালাবাদ গ্যাস। এভাবে দুই পক্ষের মধ্যে বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৮৬ কোটি টাকা।
২০২০ সালে বর্ধিত হারে বিল পরিশোধের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ দিলে আদালতের দ্বারস্থ হয় লাফার্জহোলসিম। ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি আদালত গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেন এবং বকেয়ার সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
পরে জালালাবাদ গ্যাস লিভ টু আপিল দায়ের করলে আপিল বিভাগ বিইআরসি নির্ধারিত দরে গ্যাস বিল পরিশোধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বকেয়ার মধ্যে প্রথম মাসে ১০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী সময়ে প্রতি তিন মাসে ১০ কোটি টাকা করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই আদেশ অনুযায়ী লাফার্জহোলসিম ৯০ কোটি ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ করে।
আদেশে আরও বলা হয়, নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ৭ ফেব্রুয়ারি দেওয়া সংযোগ বিচ্ছিন্নের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বাতিল বলে গণ্য হবে। ওই আদেশের পর ২০২৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিইআরসি নির্ধারিত দরে বিল এবং বকেয়া বাবদ প্রায় ৯০ কোটি টাকা জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সালিশি মামলায় (পিসিএ ২০২১-২১) দুই-এক অনুপাতে লাফার্জের পক্ষে রায় আসে। এরপর প্রতিষ্ঠানটি আগের নির্ধারিত দরে আংশিক বিল পরিশোধ শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট বিভাগ আরবিট্রেশন আবেদন (০৫/২০২১) নিয়ে দীর্ঘ শুনানি শেষে পূর্ণাঙ্গ রায় দেন। জালালাবাদ গ্যাস ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট ওই রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পায়। রায়ে বলা হয়, লিভ টু আপিল মামলা (৬৯৪/২০২১) অনুযায়ী কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা এখনো বহাল রয়েছে। ওই আদেশের বিরুদ্ধে কোনো রিভিউ বা রিভিশন হয়নি। ফলে আপিল বিভাগের নির্দেশনা কার্যকর রয়েছে এবং এ বিষয়ে নতুন করে আদেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
এরপর বকেয়া আদায়ে উদ্যোগী হয় জালালাবাদ গ্যাস ও পেট্রোবাংলা। তবে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
জানা গেছে, ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি লাফার্জহোলসিমের সঙ্গে ২০ বছর মেয়াদি গ্যাস সরবরাহ চুক্তি করে জালালাবাদ গ্যাস। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি চুক্তি নবায়ন না করার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সমালোচনার মধ্যেই লাফার্জহোলসিমের সঙ্গে নতুন করে ১০ বছরের চুক্তি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ৭৮৬ কোটি টাকার বিরোধ নিষ্পত্তি না করেই চুক্তি নবায়নে বাধ্য করা হয় জালালাবাদ গ্যাসকে।
এদিকে দেশে চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে লাফার্জহোলসিমকে দৈনিক ১ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। তাদের মতে, গ্যাসের অভাবে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি সার কারখানার বেশির ভাগই গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকছে। ফলে উচ্চমূল্যে সার আমদানি করতে হচ্ছে সরকারকে। এমন পরিস্থিতিতে সিমেন্ট উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। বিশেষ করে দেশে সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ।
লাফার্জ সুইজারল্যান্ড ও হোলসিম প্যারিসভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ছিল। লাফার্জ বিশ্বের ৬৪টি এবং হোলসিম ৭০টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করত। ২০১৪ সালে কোম্পানি দুটি একীভূত হয়ে লাফার্জহোলসিম নামে যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশে সিলেটের ছাতকে প্রতিষ্ঠানটির সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে দুটি এবং খুলনার মোংলায় একটি গ্রাইন্ডিং স্টেশন রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে লাফার্জহোলসিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।