
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন।
ইস্তাম্বুলে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি শেষে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে বহনকারী টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমান স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ তথ্য জানিয়েছেন।
হোটেলে যাওয়ার পথে নেতাকর্মীদের অভ্যর্থনা
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর মোটরশোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয় ‘হাইয়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলে। নিউইয়র্ক সফরের পুরো সময় এই হোটেলেই তাঁর অবস্থান করার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে হোটেলের সামনে আগে থেকেই জড়ো হন বিএনপির নেতা-কর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন হাতে তারা মিছিল করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীও হাসিমুখে হাত নেড়ে নেতা-কর্মীদের অভ্যর্থনার জবাব দেন।
বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ইউরোপ থেকে জড়ো হন নেতাকর্মীরা
প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে নিউইয়র্কে থাকা বিএনপির নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ থেকেও নেতাকর্মীরা নিউইয়র্কে আসেন।
ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, মিশিগান ও জর্জিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আসা নেতাকর্মীরা দুপুর থেকেই জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশে জড়ো হতে থাকেন।
তাদের হাতে ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত ব্যানার ও ফেস্টুন। অপেক্ষারত নেতাকর্মীরা মাঝেমধ্যে স্লোগানও দেন—‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম।’
নেতাকর্মীদের ভাষ্য, তারেক রহমানের এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফর কেবল প্রটোকলভিত্তিক কোনো সমাবেশ নয়। তাদের মতে, বৈশ্বিক নীতিনির্ধারক ও মার্কিন মহলের সামনে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরার জন্য এটি একটি উন্মুক্ত মঞ্চ।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নের মতো বিষয় গুরুত্ব পাবে।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ও তাঁর ভাষণে প্রাধান্য পাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি
২২ সেপ্টেম্বর
সফরের দ্বিতীয় দিনে সকালে জাতিসংঘ সদর দফতরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের জন্য দেওয়া স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এরপর ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেবেন তিনি।
দিনটিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ের ফিলস-আইমের সঙ্গে পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক এবং মেটা প্ল্যাটফর্মসের প্রধান বৈশ্বিক বিষয়াবলি কর্মকর্তা জোয়েল কাপলানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।
সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর
২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টেও তিনি অংশ নেবেন। পাশাপাশি ‘জলবায়ু পদক্ষেপ এবং ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন।
ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ড. ব্রেন্ডন নেলসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
২৪ সেপ্টেম্বর
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করার কথা রয়েছে তাঁর।
এ ছাড়া মাতৃ ও নবজাতকের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু রোধসংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রারম্ভিক বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এরপর নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। তবে সময় পরিবর্তন হতে পারে। তাঁর বক্তব্যের জন্য বরাদ্দ সময় ১৫ মিনিট।
রাতে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি।
২৫ সেপ্টেম্বর
২৫ সেপ্টেম্বর জেপিমরগান হেডকোয়ার্টার্সে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সূচিও রয়েছে।
এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট প্রিন্স জাইদ আল হুসেইনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন তিনি।
পরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
সফরসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
পিতা-মাতার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়া একটি অনন্য নজির তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।