
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সরকার উদ্বিগ্ন নয় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার দাবি, দলটির এ ধরনের তৎপরতা নতুন নয়; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাগুলোতে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বলে তারা শুনেছেন। ওই কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে রাতের বেলায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছি, পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি, মাফিয়া শক্তি, নিষিদ্ধঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, আইসিটি (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) কোর্টের একটা রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তথাকথিত কর্মসূচি দিয়েছে। সেটা মনে হয় আজকে ২০ তারিখ, লকডাউন না কি যেন নাম দিয়েছে। সেটাকে উদ্দেশ্য করে রাজধানীতে কিছু ককটেলবাজি করেছে রাতের অন্ধকারে দুই-একটি জায়গায়।’
ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেকটা আসামিকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি, মোটরসাইকেলসহ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হাইকোর্টের ফটকের সামনে যারা একটা ককটেল মেরেছিল, তাদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীর ঘটনায়ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলো নিয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, রাতে বিভিন্ন স্থানে চালক ও হেলপারবিহীন অবস্থায় রাখা বাস এবং পরিত্যক্ত বাসকে লক্ষ্য করে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তারা কিছু বাস, পরিত্যক্ত বাস এবং যেগুলো চালক ও হেলপারবিহীন অবস্থায় বিভিন্ন জায়গায় পার্কিং করা থাকে রাতে, সেগুলো টার্গেট করে দু-একটাতে অগ্নিসংযোগ করেছে, আপনারা দেখেছেন। এগুলোও আমরা ফাইন্ড আউট করার চেষ্টা করছি সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে। তাদের শনাক্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আওয়ামী লীগের বর্তমান তৎপরতাকে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তাদের এ অপতৎপরতা আগে থেকেই দৃশ্যমান ছিল। এগুলোতে আমরা খুব একটা মনোযোগ দিচ্ছি না।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বার্তা দিয়েছেন এবং এর মধ্যে আওয়ামী লীগ মিছিল ও ‘লকডাউন’ কর্মসূচি দিয়েছে—এমন পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা লকডাউন শব্দ শুনেছি, তো এখানে লকডাউন কি দৃশ্যমান হয়েছে? এগুলো জাতি প্রত্যাখ্যান করছে।’
আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যেই আওয়ামী শক্তি এক হাজার ৪০০ লোকের প্রাণ নিয়েছে, ম্যাসাকার করেছে, গণহত্যা চালিয়েছে—এটা জাতিসংঘের রিপোর্ট, আমাদের রিপোর্ট অনুসারে সেটা দুই হাজারের বেশি। সেই গণহত্যাকারীরা এখনো জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেনি, ভুল স্বীকার করেনি, উচ্চবাচ্য করছে বিদেশে বসে। তাদের এসব অপতৎপরতায় আমরা মোটেই শঙ্কিত না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই জাতি তাদের কখনো এই দেশে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করবে না। এগুলো অপাংক্তেয়। তারা ডিসেম্বরে ফিরবে বলে, না ফেব্রুয়ারিতে ফিরবে বলে, এগুলোতে আমাদের কোনো মনোযোগ নেই।’
বিরোধী দলগুলোর লংমার্চের কর্মসূচির সুযোগ আওয়ামী লীগ নিচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা ও দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। বিভিন্ন দাবি নিয়ে বিরোধী দলগুলো যে লংমার্চ করেছে, সেগুলো শান্তিপূর্ণভাবে পালনের সুযোগ দেওয়া সরকারের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চট্টগ্রাম এবং ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলমুখী লংমার্চে কোনো সহিংসতা বা সংঘর্ষ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাদের কিছু দাবি ছিল, সেই দাবিগুলো নিয়ে তারা লংমার্চ করেছে, করতেই পারে। এটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, তারা তাদের কর্মসূচি পালন করবে। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তারা যেন শান্তিপূর্ণভাবে সেই কর্মসূচি পালন করতে পারে, এর সহযোগিতা করা। আমরা করেছি।’
নির্বাচন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘পাঁচ বছর পরে নির্বাচন হবে বিধি মোতাবেক, নিয়ম মোতাবেক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। তখন জনমত কাদের পক্ষে যায় সেটা তখন দেখা যাবে। এখন এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে দেশে সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো প্রচেষ্টা কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব ঘটনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের কোনো সম্পর্ক নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় যে অংশগ্রহণ, এটা প্রতিবছর একবার হয়ে থাকে, তিনি তাতে যাচ্ছেন। এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন। এর সঙ্গে এসব ঘটনার কোনো সম্পর্ক নাই।’
বিরোধী দলগুলোর লংমার্চের কর্মসূচি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের আরও দুটি কর্মসূচি রয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া কর্মসূচির অংশ হিসেবে সরকার দেখছে বলে জানান তিনি।
তবে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তি এগুলো করে আসছে আরও দুই বছর আগে থেকেই। এটা ধারাবাহিকতা। তারা আর বিরোধীদলের কর্মসূচির সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র আছে কি না সেটা আপনারাই খুঁজে বের করুন, আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।’
তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে বিরোধী দলগুলোর দাবির প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এসব বিষয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করে তাদের মতামতও নেওয়া হয়েছে। তার মতে, ওই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এসব সমস্যার সমাধানের পথে এগোনো উচিত ছিল।