
একসময় পদ্মায় জাল ফেললেই ইলিশে ভরে উঠত জেলেদের ডোল। মৌসুমি সময়ে নদীর ঘাটগুলোতে জমে উঠত ইলিশ কেনাবেচার ব্যস্ততা। সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত। পদ্মায় দীর্ঘ সময় ধরে জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। ফলে ইলিশ ধরে সংসার চালানো মানুষগুলোর জীবনে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
নৌকা নিয়ে নদীতে নামার খরচ, সময় ও শ্রমের তুলনায় আয় খুবই কমে যাওয়ায় অনেক জেলেই বাধ্য হয়ে নদীর পেশা ছেড়ে অন্য কাজ বেছে নিচ্ছেন।
পদ্মা-যমুনার ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষ
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা পদ্মা ও যমুনা নদীর সঙ্গে যুক্ত। এসব এলাকার মৎস্যজীবীদের আয়ের বড় একটি উৎস ছিল পদ্মার ইলিশ।
তবে কয়েক বছর ধরে নদীতে মাছের সংকট তীব্র হওয়ায় সেই নির্ভরতার জায়গাটিই এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইলিশ কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে নদীকেন্দ্রিক পরিবারগুলোর জীবনে।
চার বছরে ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন
মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’-এর তথ্যেও লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মা থেকে ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল। পরের অর্থবছর ২০২১-২২ সালে তা কমে হয় ১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১২২ মেট্রিক টনে। কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবারও তা কমে ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টনে নেমে আসে।
সবচেয়ে বড় পতন দেখা যায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। ওই সময়ে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ মাত্র ৬২২ মেট্রিক টনে নেমে যায়।
হিসাব অনুযায়ী, চার বছরের ব্যবধানে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন। শতাংশের হিসাবে এই পতন প্রায় ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই ইলিশ আহরণ কমেছে ৪৬৮ মেট্রিক টন।
নদীতে মাছ না পেয়ে কৃষিকাজে জেলে
সরকারি হিসাবের সঙ্গে নদীপাড়ের জেলেদের বাস্তব অভিজ্ঞতারও মিল রয়েছে। হরিরামপুর উপজেলার বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক হোসেন ব্যাপারী জানান, শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসারের খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এ কারণে মাছ ধরার পাশাপাশি তাকে কৃষিকাজও করতে হচ্ছে। তার ধারণা, নদী আগের মতো গভীর না থাকায় ইলিশও আগের মতো আসছে না।
ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লার অভিজ্ঞতাও একই রকম। তার মতে, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি যান্ত্রিক নৌযান ও জাহাজের শব্দের কারণেও ইলিশ নদী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, জীবিকার সংকটে পড়ে দড়িকান্দি গ্রামের নিবন্ধিত জেলে লিটন নৌকা ও জাল বিক্রি করে দিয়েছেন। এরপর তিনি রিকশা চালানো শুরু করেছেন।
নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনেও সংকট
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক ও পরিবেশগত নানা পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে ইলিশের বিচরণে। সমুদ্র থেকে মিঠাপানিতে ডিম ছাড়তে আসার পথে নদীতে পলি জমে তৈরি হওয়া ডুবোচর ও চর ইলিশের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
এ ছাড়া নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিবর্তন, পানির প্রবাহে পরিবর্তন এবং বৃষ্টিপাতের সময়ের পরিবর্তনও ইলিশের বিচরণে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন তারা।
অপরিকল্পিত বর্জ্যের কারণে নদীর পানি দূষিত হওয়া এবং নদীর স্বাভাবিক খাদ্যচক্র নষ্ট হয়ে যাওয়াকেও ইলিশের সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিষিদ্ধ জালে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন
ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তারের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি হচ্ছে। কারেন্ট জাল এবং ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন হচ্ছে। এতে ইলিশের স্বাভাবিক প্রজননচক্রও ব্যাহত হচ্ছে।
ইলিশ রক্ষায় ২৬২ অভিযান, জব্দ ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার জাল
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইলিশ সংরক্ষণে ২৬২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একই সময়ে ৭৫টি মোবাইল কোর্টও পরিচালিত হয়।
এসব অভিযানে ৩ মেট্রিক টন ইলিশ এবং ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অবৈধভাবে ইলিশ শিকারের ঘটনায় ১০৯টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ৭০ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে মোট ২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
অবৈধ শিকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চলছে
হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, নদীতে চর জেগে ওঠা, জলযানের চলাচল, পানিদূষণ এবং অবৈধ জালের ব্যবহার ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
তিনি বলেন, অবৈধভাবে ইলিশ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, নাব্যতা সংকট, দূষণ ও অসচেতনতার কারণে পদ্মা-যমুনায় ইলিশের সংকট তৈরি হয়েছে। তবে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষায় সরকারি নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।