
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও এখনো প্রকাশিত হয়নি নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর গেজেট। গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হলেও এর গেজেট এবং বাস্তবায়ন নির্দেশনা জারির অপেক্ষায় রয়েছে।
এরই মধ্যে নতুন পে স্কেলে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, মোবাইল, যাতায়াত ও টিফিন ভাতাসহ মোট ১১টি ক্ষেত্রে পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা কমানো, প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন ভাতা চালু এবং সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে।
নতুন কাঠামোয় বর্তমান ২০টি গ্রেডই রাখা হচ্ছে। গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন বাড়ানোর হার ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর হবে না; ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অন্যদিকে বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
১. বাড়িভাড়া ভাতায় কমছে শতাংশ
নতুন বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের একটি হচ্ছে বাড়িভাড়া ভাতা। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এই হার কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় বর্তমানে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় সেখানে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া থাকলেও নতুন কাঠামোয় তা ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানোর কারণে শতাংশের হিসাবে বাড়িভাড়া কমলেও গ্রেড অনুযায়ী প্রকৃত টাকার পরিমাণ বাড়তে পারে। অর্থাৎ বাড়িভাড়ার হার কমিয়ে মূল বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে সামগ্রিক আর্থিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
২. বয়স অনুযায়ী বাড়বে চিকিৎসাভাতা
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতি মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসাভাতা পান। নতুন বেতন কাঠামোয় বয়সের ভিত্তিতে এই ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী চাকরিজীবীরা মাসে ৩ হাজার টাকা চিকিৎসাভাতা পাবেন। ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সীদের জন্য এ ভাতা ৪ হাজার টাকা, ৬০ বছরের বেশি থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ৬ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও বয়স বিবেচনায় চিকিৎসাভাতা বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
৩. গ্রেড অনুযায়ী বদলাবে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা সব গ্রেডেই মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন কাঠামোয় আর সব গ্রেডে একই হারে বেতন বাড়বে না।
নতুন প্রস্তাবে গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ রাখার কথা বলা হয়েছে। গ্রেড-৫-এর ক্ষেত্রে এ হার ৪ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩-এর জন্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এর জন্য ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
এর ফলে উচ্চ বেতন পাওয়া কর্মকর্তাদের মূল বেতন বেশি হলেও প্রতিবছর সেই বেতনের বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম হবে। সশস্ত্র বাহিনীতেও একই ধরনের কাঠামো অনুসরণের প্রস্তাব রয়েছে।
৪. এবার সব গ্রেডেই মোবাইল ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোয় প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মোবাইল বিল পেয়ে থাকেন।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের জন্য মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য মাসে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ফলে নিম্ন গ্রেডে থাকা কর্মচারীরাও প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট মোবাইল ভাতা পাবেন।
এ ছাড়া বিশেষ চাহিদা-সম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা চালুর সিদ্ধান্তও নতুন কাঠামোয় রাখা হয়েছে।
৫. দ্বিগুণ হচ্ছে যাতায়াত ভাতা
জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পরিবহণ খরচ বিবেচনায় সরকারি চাকরিজীবীদের যাতায়াত ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে মাসে ৩০০ টাকা যাতায়াত ভাতা দেওয়া হলেও নতুন কাঠামোয় তা দ্বিগুণ করে ৬০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতার কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বর্তমান হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
৬. টিফিন ভাতা হবে ৫০০ টাকা
নতুন কাঠামোয় টিফিন ভাতার পরিমাণও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসে ২০০ টাকা টিফিন ভাতা পান।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এই ভাতা বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করা হবে।
একই সঙ্গে ধোলাই ভাতার পরিমাণও ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
৭. প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা
নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদা-সম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য আলাদা ভাতা চালু করা হচ্ছে।
প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ দুই সন্তান এই সুবিধার আওতায় আসবে।
অর্থাৎ এই খাতে একজন সরকারি কর্মচারী মাসে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা ভাতা পেতে পারেন।
৮. কমছে বাংলা নববর্ষ ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোয় কয়েকটি ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও বাংলা নববর্ষ ভাতার হার কমানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে।
বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এই হার কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে পাহাড়ি ভাতা এবং হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বহাল থাকবে। তবে এসব ভাতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে।
এ ছাড়া ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণ বর্তমান হারের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে।
৯. পেনশনেও পরিবর্তনের প্রস্তাব
‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নিট পেনশনের নতুন সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন নিট পেনশন ১০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা হতে পারে।
পেনশন কাঠামোর এই পরিবর্তনের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বয়স অনুযায়ী চিকিৎসাভাতা বাড়ানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধাগুলো কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা গেজেট এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন নির্দেশনায় আরও স্পষ্ট হবে।
১০. উচ্চতর গ্রেড ও বিশেষ প্রণোদনায় বদল
বর্তমান নিয়মে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করার পর পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এই সময়সীমা কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে আরও ছয় বছর চাকরি করার শর্ত রাখা হচ্ছে।
পদোন্নতিযোগ্য পদে থাকা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পাবেন।
অন্যদিকে পদোন্নতির সুযোগ নেই এমন ‘ব্লকড পদে’ কর্মরতরা সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
এদিকে ২০২৪ সালে চালু করা বিশেষ প্রণোদনা নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যাবে। মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে এই প্রণোদনা চালু করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল।
১১. সশস্ত্র বাহিনীর বেতন-ভাতাতেও পুনর্নির্ধারণ
জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন ও ভাতাও পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, নন-কমব্যাট্যান্ট (এনরোল্ড) বা এনসি (ই) এবং সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে মেজর জেনারেল ও সমপদে মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে বাড়ানোর পাশাপাশি কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ করে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো বা স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ করে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জরিপ ভাতা বাড়তে পারে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বর্তমানে থাকা ৮১ ধরনের ভাতাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা বিদ্যমান হারের তুলনায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
তবে বাড়িভাড়া, যাতায়াত, কার্যভার, আপ্যায়ন, টিফিন, ধোলাই, পাহাড়ি, উৎসব, শ্রান্তি-বিনোদন, নববর্ষ, শিক্ষা সহায়ক, চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হবে।
২৪ লাখ চাকরিজীবী ও সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত উপকৃত হবেন
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী। পাশাপাশি সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও এর আওতায় আসবেন।
নতুন কাঠামোয় গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন পে স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন অর্থ বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন ও বাস্তবায়ন নির্দেশনা জারির অপেক্ষা রয়েছে।