
দীর্ঘ এক মাসের তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামীকাল রোববার দেশে এলএনজির একটি কার্গো পৌঁছানোর কথা রয়েছে। কার্গোটি মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে যুক্ত হলে ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বিশেষ করে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশা করছেন জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি কার্গো দিয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হবে না। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পরবর্তী এলএনজি কার্গোগুলো নির্ধারিত সময়ে দেশে আনা এবং এক্সিলারেট ও সামিট—দুই টার্মিনাল থেকেই নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) বিকেল ৪টা পর্যন্ত দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২২০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে মাত্র ৫৮ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে এলএনজির পুরো সরবরাহই আসছে সামিটের টার্মিনাল থেকে।
গত মাসের শেষদিকে এক্সিলারেটের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নরসিংদী, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে।
নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় ছোট-বড় শতাধিক শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাবে, বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। জেলার টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলগুলোর বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় সংকটের প্রভাব সেখানে আরও তীব্র।
গাজীপুরেও পরিস্থিতি খুব একটা ভিন্ন নয়। বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ এক পিএসআইয়ের নিচে নেমে গেছে। এতে গ্যাসনির্ভর প্রায় সাড়ে ৪০০ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানার ২০ থেকে ২২ শতাংশের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে চালু রাখা কারখানাগুলোতেও উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।
চট্টগ্রামের শিল্প খাতেও গ্যাস সংকটের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। সেখানে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। গ্যাসের চাপ কম থাকায় কিছু প্রতিষ্ঠান দুই শিফটের পরিবর্তে এক শিফটে উৎপাদন চালাচ্ছে। আবার কয়েকটি কারখানা তাদের একাধিক ইউনিট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে রোববারের এলএনজি কার্গোকে ঘিরে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কার্গোটি নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছালে খালাস শেষে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। প্রাথমিকভাবে সরবরাহ কম থাকলেও ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করা হবে।
তবে সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পরবর্তী কার্গোগুলোও নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২২০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতির মধ্যে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বর্তমানে শিল্প খাতে গ্যাসের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে নতুন করে ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে শিল্প খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, নিয়মিত গ্যাস না পেলে শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়াই নয়, রপ্তানি আদেশ হারানো, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সংকট এবং নতুন বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তাই রোববারের কার্গো দ্রুত খালাসের পাশাপাশি পরবর্তী কার্গোগুলোও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দেশে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে বন্দরনগরীর শিল্প খাতে ধীরে ধীরে অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে ইতোমধ্যে ছোট-বড় বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে শিল্পমালিকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, দ্রুত গ্যাস সংকটের সমাধান না হলে উৎপাদন আরও কমবে। একই সঙ্গে ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে সেগুলো প্রতিযোগী দেশগুলোর হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বায়েজিদ, অক্সিজেন ও কালুরঘাট শিল্প এলাকায় গ্যাসের অভাবে অর্ধশতাধিক ছোট ও মাঝারি পোশাক, বস্ত্র, সুতা ও অ্যাক্সেসরিজ কারখানা বন্ধ রয়েছে। গ্যাসনির্ভর নিটিং, ডাইং, প্রিন্টিং ও কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। কম গ্যাসের চাপ সরাসরি এসব কারখানার উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোশাক ও বস্ত্র খাতের বাইরেও রড, সিমেন্ট, খাদ্যসহ প্রায় সব ধরনের গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানায় সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
কারখানা স্বাভাবিকভাবে চালু রাখা সম্ভব না হওয়ায় কিছু প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনের কাঁচামালও নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে গ্যাস সংকট শিল্প খাতের উৎপাদন ও ব্যবসায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে এই সংকট ঠিক কবে নাগাদ পুরোপুরি কাটবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা পাওয়া যাচ্ছে না।