
মরণঘাতী ডেঙ্গু কেবল মানুষের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট এই অর্থনৈতিক চাপ নিরসনে বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) আয়োজিত ‘ডেঙ্গু জ্বর বিষয়ক সচেতনতামূলক সায়েন্টিফিক সেমিনারে’ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এসব সতর্কবার্তা দেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, বছরে গড়ে ৫০০ জনের মৃত্যু এবং ১ লক্ষের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার যে সরকারি পরিসংখ্যান রয়েছে, তা মূল পরিস্থিতির সামান্য অংশ মাত্র। বিপুলসংখ্যক মানুষ নিবন্ধনহীন বা অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করায় তাদের তথ্য সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
এডিসের বিস্তার ঠেকাতে মশারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডা. ফরিদ বলেন,
'ম্যালেরিয়ার বাহক এনোফিলিস মশা রাতে কামড়ায়, তাই মশারি কার্যকর প্রতিরোধ হতে পারে। কিন্তু ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। ফলে শুধু মশারির ওপর নির্ভর করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং লার্ভা নিধনেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।'
স্বাস্থ্য খাতের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন যে, বাজেট বা অর্থের ঘাটতির চেয়ে সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাবই মূল বাধা। ডেঙ্গু মোকাবেলায় নীতিনির্ধারণী ধাপে কার্যকর মেলবন্ধন নিশ্চিত করতে সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটিকে দ্রুত সক্রিয় করার পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগম ভ্রান্ত ধারণা ও অপচিকিৎসা বর্জন করে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জনসচেতনতা তৈরির ওপর জোর দিয়ে বলেন,
'ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে ওঠেন।'
অনুষ্ঠানে বৈজ্ঞানিক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর-উল আলম (সোহেল)। তিনি উল্লেখ করেন যে, শারীরিক তাপমাত্রা বা জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে অবিলম্বে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার গ্রহণ এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এনডিএফের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক ছিলেন বিসিএস হেলথ ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মাহবুব ইসলাম মজুমদার এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল্লাহ সাঈদ খান।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন,
'ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তাই হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের বিকল্প নেই।'