
ঐতিহাসিক জুলাই সনদকে মূল ভিত্তি ধরে দেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের ভেতরে সরকারি ও বিরোধী দল যৌথভাবে ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আইনসভার বাইরেও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট মৌলিক ইস্যুগুলোতে জনমত গঠন এবং বিভিন্ন সংস্কারমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যের প্রতি সহমত প্রকাশ করে সরকারপ্রধান জানান, রাজনৈতিক মতাদর্শে উভয় পক্ষের মধ্যে ভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে জনগণের কল্যাণ ও রাষ্ট্র গঠনে কিছু জায়গায় কোনো আপস নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা, কৃষক, শ্রমিক, যুবক ও প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার প্রশ্নে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব।’
দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘আজ আমাদের অঙ্গীকার হোক—এই বাংলাদেশে আর কখনো ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচারের শেকড় গজাতে দেওয়া হবে না এবং কেউ যেন আর কখনো এই দেশকে কোনো পরাশ্রয়ী রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে।’
সংসদ ও চলমান সরকার যে পুরোপুরি আমজনতার, সেই বিষয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই সংহতির বার্তাটি এমন এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এলো, যখন ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি পাঠানোর আহ্বান জানানো হলেও জামায়াতে ইসলামী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
এর আগে, গত ১৬ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান স্পষ্ট করেছিলেন যে, সরকারের প্রস্তাবিত এই কমিটিতে বিরোধী দল থেকে কোনো সদস্য দেওয়া হবে না। তখন তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা কেবল সংশোধন নয়, সংবিধানের সংস্কার চান।’
নিজের রাজনৈতিক রূপকল্প তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি এমন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে প্রবৃদ্ধি হবে সাম্যভিত্তিক, অর্থনীতি হবে সর্বজনীন, প্রশাসন হবে দায়বদ্ধ এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবন হবে সুরক্ষিত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও সম্ভাবনাময়।
তিনি বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সম্পদে নয়; বরং সুশাসন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও জনগণের আস্থায় নিহিত। টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।’
তারেক রহমান মনে করেন, দেশের বর্তমান প্রজন্মের মানুষ এখন সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি রাষ্ট্র দেখতে চায়।
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রত্যাশা পূরণ করা শুধু বর্তমান সরকারের নয়, সংসদের প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব। নিজ নিজ অবস্থান থেকে একসঙ্গে কাজ করেই আমাদের তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আইনি সেবা পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ দেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে চালু হওয়া সরকারি আইনি সহায়তা (লিগ্যাল এইড) কার্যক্রমের পরিধি বর্তমান সরকার আরও বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি, সদ্য প্রস্তাবিত বাজেটে বিচার বিভাগের বার্ষিক বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
একই সাথে বিচারকদের আবাসন সমস্যা সমাধান, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা এবং আদালত ভবনের সংকট নিরসনে সুপ্রিম কোর্টের জন্য অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষকে সেবা দিতে হলে প্রশাসনকে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসনকে জবাবদিহিমূলক করার পাশাপাশি ন্যায্য বেতন কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে রাষ্ট্রগঠনে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।’
বক্তব্যের শেষাংশে আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অচলাবস্থা ভাঙার ঘোষণা দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন: ‘আমরা এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দেশের জনগণের কাছে সেই অঙ্গীকারই করছি।’