
প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির নামে আমলাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরের লাগাম টানতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমানের জন্য তৈরি করা ফ্রান্সে যাওয়ার একটি সরকারি সফর প্রস্তাব সরাসরি বাতিল করে দিয়েছেন সরকারপ্রধান। ফাইলটি নাকচ করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী এক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নন এমন কর্মকর্তার বিদেশ সফরের যৌক্তিকতা নেই। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এ ধরনের সফরে অংশ নিতে পারেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘আউটডোর লাইটিং অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার’ (এএলএসি) সরজমিনে পরিদর্শন করা এবং আধুনিক বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী স্ট্রিট লাইটিং প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়ার উদ্দেশ্যে রাসিক প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান ও বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ বি এম আসাদুজ্জামান সুইটের যৌথভাবে ফ্রান্স ভ্রমণের একটি ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। আজ সোমবার (৮ জুন) ওই ফাইলটির ওপর চূড়ান্ত অনুশাসন বা নির্দেশনা জারি করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নেওয়া এই কড়া ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে পুরোপুরি নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি সালেহ শিবলী।
সফর প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ নোটে প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেন যে, স্ট্রিট লাইটিং প্রযুক্তি বিষয়ে প্রকৌশলীর অর্জিত জ্ঞান সিটি করপোরেশনের কাজে লাগবে। তবে প্রশাসক প্রকৌশলী নন, তাই তার এ সফরে অংশগ্রহণের বিশেষ গুরুত্ব নেই। প্রয়োজনে শুধু নির্বাহী প্রকৌশলীকে সফরের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
এর পাশাপাশি দেশের স্থানীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতে এই ধরণের আধুনিক ও উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কিংবা দেশের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারিগরি সহযোগিতা ও পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান।
উচ্চপদস্থ সরকারি কর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরের ফাইল প্রধানমন্ত্রীর হাত দিয়ে বাতিল হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে মশকনিধন সংক্রান্ত আধুনিক ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম সশরীরে পর্যবেক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচজন শীর্ষ কর্মকর্তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের একটি বড় প্রস্তাবও একইভাবে নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় ফাইল বাতিলের পেছনে যুক্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন যে, মশকনিধনের উপায় জানতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; দেশের বাস্তব পরিবেশ থেকেই কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন সম্ভব।
শুধু সরকারি অর্থের অপচয় রোধই নয়, বিদ্যমান সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই রকম নীতিগত ও অনড় অবস্থান দেখিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। দায়িত্বশীল প্রশাসনিক সূত্র থেকে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল আজহার আগে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) নাম পরিবর্তন করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে নামকরণের একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব পাঠানো হলে সেটিও অনুমোদন দেননি তিনি। সেই ফাইলের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দেন যে, পুরোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন না করে বরং নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে সেটির নামকরণ করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এসব ধারাবাহিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়েছে—প্রথমত, রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রকৃত কাজের প্রয়োজনীয়তা ও পেশাগত সংশ্লিষ্টতাকে কঠোরভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে; এবং দ্বিতীয়ত, চলমান কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নাম বদলের সস্তা রাজনীতির পরিবর্তে নতুন নতুন টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জাতীয় নীতি প্রতিফলিত হচ্ছে।