
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে আবারও কালো টাকা ও পাচারকৃত অর্থ বৈধ করার যে তোড়জোড় চলছে, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়া কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরাতে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ দেওয়ার এই সম্ভাব্য পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ নীতিহীন ও হতাশাজনক বলে আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি।
গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে টিআইবি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আবাসন খাতের মন্দা কাটানো, শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধি তরান্বিত করার অজুহাতে এই অনৈতিক সুবিধা দেওয়া সরকারের জন্য চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। এটি প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার শামিল। তাই এই অসাংবিধানিক চর্চা চিরতরে বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে আঙুল তুলে বলেন, স্বাধীনতার পর প্রায় সব সরকারই কোনো না কোনোভাবে ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ বৈধ করার সুযোগ দিয়েছে, যা সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের চেতনার পরিপন্থী। বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে এ প্রক্রিয়া আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। কখনও বিনা প্রশ্নে, আবার কখনও কম করহারে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের ফলে করফাঁকি বেড়েছে এবং সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হয়েছেন।
তিনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে আরও বলেন, "কালো টাকা সাদা করার বিধান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন ধাপে বন্ধ করলেও, বর্তমান সরকারের সেটি পুনরায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এক ধাপ এগিয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে পড়ার মতো। কারণ কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রদান রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ারই শামিল, যা বর্তমান সরকারকে বিতর্কিত করার সুযোগ সৃষ্টি করছে। তা ছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অঙ্গীকার করে বিপুল জনরায়ে নির্বাচিত সরকারের এই অনৈতিক ও আত্মঘাতী চর্চা পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে কী বার্তা দিতে চাচ্ছেন? এক্ষেত্রে সরকারকে স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী শ্রেণির চেয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বিবেচনাসহ জনআকাঙ্ক্ষা মূল্যায়নে আন্তরিক হওয়া জরুরি।’"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘জাতীয় জুলাই সনদ ২০২৫’-এর ৬৭ ধারায় অনুপার্জিত আয় ভোগ করার সুযোগ রদ করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা বাস্তবায়নে বিএনপিসহ দেশের সব রাজনৈতিক দল ও জোট একযোগে সংহতি প্রকাশ করেছে। এ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারসহ ‘দুর্নীতির সাথে কোনো আপস করবে না’ মর্মে অঙ্গীকার করেছে। অথচ গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, আবাসন খাতের লবির প্রভাবে আসন্ন বাজেটে দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ অন্য যে কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার কোনো ধরনের প্রশ্ন করার সুযোগ না রেখে ‘পরিপূর্ণ দায়মুক্তি’প্রদানের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হবে। তা ছাড়া দুদক সংস্কার প্রতিবেদনে (সুপারিশ-৩) কালো টাকা সাদা করার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। যার প্রতিও বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। মনে রাখতে হবে, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে বারবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েও রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যায়নি। বরং মানুষকে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে অনিয়ম-দুর্নীতিকে সরকার সুরক্ষা, প্রশ্রয় ও বিচারহীনতা দিচ্ছে।
পাচার হওয়া টাকা সাধারণ ক্ষমার আওতায় দেশে ফিরিয়ে আনার সরকারি রূপরেখা নিয়ে টিআইবি প্রধান বলেন, "বিদেশ থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের অর্থ ফেরত আনার আন্তরিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সরকার যদি এই পরিকল্পনা করে থাকে, সেটা হতে পারে। তবে যারা অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত তারা যেন এ সুযোগ নিতে না পারেন। অধিকন্তু অর্থ পাচারের কারণে ইতোমধ্যে যাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে তাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে, এবং তাদের জন্য কোনো বিবেচনায়ই ‘সাধারণ ক্ষমা’প্রযোজ্য নয়, তা সরকারে নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, বিগত কতৃত্ববাদী শাসনামলে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় পরবর্তীতে কখনই আর এই সুযোগ প্রদান করা হয়নি। অর্থাৎ এ জাতীয় সুযোগ প্রদান একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। ইতোমধ্যে সরকার তার সার্বিক কার্যক্রমে কিছু ইতিবাচক ও আশাজাগানিয়া দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হয়েছে, তার-ই ধারাবাহিকতায় এবার কালো টাকা বৈধ করার অসাংবিধানিক, বৈষম্যমূলক ও দুর্নীতিসহায়ক বিধান করা থেকে বিরত থেকে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থানের যথার্থতার উদাহরণ স্থাপন করবে এই প্রত্যাশা করছি।"