
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার গঠন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন একদিকে তিস্তা ও গঙ্গা চুক্তির মতো অমীমাংসিত ইস্যুতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে সীমান্ত রাজনীতি, ‘পুশ-ইন’ আতঙ্ক এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তোলার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
দীর্ঘ সময়ের ‘মমতা যুগ’ শেষে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ সমীকরণেই নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’, এনআরসি, সিএএ ও অনুপ্রবেশ ইস্যুকে ঘিরে বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে সীমান্তে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এনআরসি ও এসআইআরের মতো প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের বড় অংশ মুসলিম হওয়ায় বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।’
তার মতে, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে একই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় থাকলে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ইস্যুতে সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়লে সীমান্তের দুই পাশেই সামাজিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্ক ভাদুড়িও পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুটি পরিকল্পিতভাবে সামনে আনা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘বাংলাভাষী মুসলিমদের রোহিঙ্গা বা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে উপস্থাপন করে ভোটের মেরুকরণ ঘটানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, সীমান্তের দুই পাশে যদি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শক্তিশালী হয়, তাহলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সমর্থন সুসংহত করতে সাম্প্রদায়িক আবেগকে ব্যবহার করলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়বে।
তবে পুরো পরিস্থিতিকে কেবল নেতিবাচক হিসেবেও দেখছেন না বিশ্লেষকদের একটি অংশ। তাদের মতে, এতদিন তিস্তা পানি বণ্টন ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিকে কেন্দ্রীয় সরকার বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরত। এখন কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ নতুনভাবে আলোচনার সুযোগ পেতে পারে।
আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘তিস্তা চুক্তি নিয়ে দিল্লির যে রাজনৈতিক অজুহাত ছিল, সেটি এখন আর থাকবে না। ফলে বাংলাদেশ আরও জোরালোভাবে ন্যায্য হিস্যা দাবি করতে পারবে।’
এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সোমবার (৪ মে) সাংবাদিকদের বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সরকার মনে করে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন ও ভিসা জটিলতার মতো বিষয়ও আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হবে।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কলকাতাভিত্তিক সাংবাদিক শুভজিৎ বাগচীর মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠবে। সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়লে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এবং মানবাধিকার সংকটও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে কূটনৈতিক দরকষাকষির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্ত রাজনীতি ও পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনের ঝুঁকিও বাড়ছে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ঢাকা ও দিল্লির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বোঝাপড়া এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর।