
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি এসে পড়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়—সরকার সংকট না থাকার দাবি করলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না চালকেরা, ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গণপরিবহনসহ সামগ্রিক নগরজীবন।
রাজধানীর বাস টার্মিনাল ও কাউন্টারগুলো ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে একটি ফিলিং স্টেশন থেকেই সহজে পর্যাপ্ত জ্বালানি সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু এখন একটি বাসের জন্য পাঁচ থেকে ছয়টি পাম্প ঘুরতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে গাড়ি ছাড়তে হচ্ছে। ছোট পরিবহন সংস্থাগুলো এই পরিস্থিতিতে ট্রিপ কমিয়ে দিয়েছে।
পাম্পে পাম্পে তেলের হাহাকার
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে বাস, মিনিবাস, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ সব ধরনের যানবাহনের দীর্ঘ সারি। কোথাও তেল নেই, আবার কোথাও সীমিত সরবরাহের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে খালি হাতে ফিরছেন। অনেক চালককে একাধিক পাম্প ঘুরে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে তিশা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার আহসান হাবিব জানান, তাদের বাস প্রতি ঘণ্টায় ছাড়ার কথা থাকলেও জ্বালানি সংকটে তা সম্ভব হচ্ছে না। একটি বাসে তেল তুলতে পাঁচটি পর্যন্ত পাম্পে যেতে হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে দেরিতে গাড়ি ছাড়তে হচ্ছে, আর এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।
একই টার্মিনালের যাত্রী তৌহিদুল বলেন, তার যাত্রা প্রায় এক ঘণ্টা পিছিয়েছে। প্রথমে যান্ত্রিক সমস্যার কথা বলা হলেও পরে তিনি জানতে পারেন, আসল কারণ জ্বালানির সংকট।
তিশা পরিবহনের আরেক যাত্রী তুহিন জানান, তাকে প্রথমে একটি বাসে উঠানো হলেও জ্বালানি না থাকায় সেটি ছাড়েনি। পরে অন্য বাসে যেতে হওয়ায় তার যাত্রা আরও বিলম্বিত হয়।
লাবিবা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার হাসান বলেন, কিছু ক্ষেত্রে এক থেকে দুই ঘণ্টা দেরি হচ্ছে। একটি বাসের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পেতে পাঁচ থেকে ছয়টি পাম্পে যেতে হচ্ছে, যা সময়ক্ষেপণের প্রধান কারণ। তিনি আরও জানান, গাজীপুরের একটি পাম্প থেকে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ লিটার ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে, এরপর অন্য পাম্পে যেতে হচ্ছে।
চালকদের আয় বন্ধের পথে
আজিমপুর-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী ‘ভিআইপি’ বাসের চালক মোহাম্মদ মামুন জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে তিনি নিয়মিত বাস চালাতে পারছেন না। এতে তার আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। তার মতো হাজারো পরিবহন শ্রমিক এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
যাত্রী-চালক বিরোধ বাড়ছে
মাঝপথে বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। চালকদের ভাষ্য, রাস্তায় তেল শেষ হলে পাম্পে লাইনে দাঁড়াতে গেলে যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং বাগবিতণ্ডা সৃষ্টি হয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
অপচয় হচ্ছে কর্মঘণ্টা, থমকে যাচ্ছে নগরজীবন
রাজধানীজুড়ে জ্বালানি সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও নিশ্চিতভাবে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে প্রতিদিন শত শত কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে নগরজীবনের গতি।