
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, চুক্তিটি করার আগে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল—বিএনপি ও জামায়াতের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি গোপনে বা হঠাৎ করে সম্পন্ন হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, “ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ আমাদের প্রধান দুটি দলের প্রধানের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন এবং তারাও এতে সম্মতি দিয়েছিল।
“সুতরাং এমন না যে, এইটা আমরা অন্ধকারে করেছি।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তি স্বাক্ষরকে কেন্দ্র করে যে সমালোচনা উঠেছে, তার প্রেক্ষাপটেই তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর বিএনপির নতুন সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান খলিলুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে বাংলাদেশের পক্ষে তিনিই প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
চুক্তির সময়কাল নিয়ে তিনি বলেন, “এই ডিলটা কিন্তু ঠিক তিনদিন আগে শেষ হয়েছে, তা নয়।”
ঘটনাক্রম ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, “এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম তাদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আমরা কথা বলি।
“এই রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করা হয় সম্ভবত এপ্রিল মাসে এবং তারপর থেকে এই আলোচনা শুরু হয়। এপ্রিল থেকে জুলাই টানা আলোচনা চলেছে। শুধু আমাদের না, আরও অনেক দেশের সঙ্গে। সেই আলোচনার পরে কিন্তু আমরা ২০ শতাংশ পেয়েছিলাম, আপনাদের হয়ত খেয়াল আছে। সেই সময় মোটামুটিভাবে এগ্রিমেন্টটা হয়ে গেছিল।”
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শূন্য শতাংশ পাল্টা শুল্ক এবং ‘রুলস অব অরিজিন’ নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করতে সময় লাগে বলে জানান তিনি। খলিলুর রহমান বলেন, “একটা হচ্ছে, আমরা তাদেরকে বলেছিলাম যে, আমেরিকান কটন দিয়ে তৈরি বা আমেরিকান ম্যানমেড ফাইবার দিয়ে তৈরি যে পোশাক আমরা তাদের কাছে পাঠাব, সেইখানে আমরা জিরো রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চাই, সেইটা করতে তাদের সময় লেগেছে। এটা কিন্তু আমাদের স্বার্থে।
“আর দ্বিতীয় হচ্ছে রুলস অব অরিজিন, তাতেও তারা সময় নিয়েছেন। এগ্রিমেন্ট আমরা করে রেখেছিলাম জুলাইয়ের ৩১ তারিখে এবং এক তারিখে আমরা ২০% পেয়েছিলাম। সুতরাং এটা যে চট করে নির্বাচনের তিন দিন আগে করা হয়েছে, সেটা ঠিক নয়।”
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে।
পরে আলোচনার মাধ্যমে এ হার ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। এর আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। ফলে মোট শুল্কহার দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।
দীর্ঘ নয় মাসের আলোচনার পর পারস্পরিক শুল্ক কাঠামো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছায় বাংলাদেশ, যার ফলে আগের তুলনায় শুল্কহার ১ শতাংশ কমে।
চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি আরও কিছু পণ্য আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে গম আমদানি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং তুলা ও সয়াবিনসহ অন্যান্য পণ্য আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন দিন আগে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় সমালোচনা উঠেছে বিভিন্ন মহলে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে, একটি অনির্বাচিত সরকার কীভাবে এমন চুক্তি করতে পারে, যার দায় ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের ওপর বর্তাবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, তারা এ ঘটনায় ‘হতভম্ব’ ও ‘স্তম্ভিত’। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি অনির্বাচিত সরকার কীভাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করে যেতে পারে।