
দীর্ঘ দমন-পীড়নের অধ্যায় পেরিয়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে—এমন দাবি করেছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, চব্বিশের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে দেশ নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ১৬ বছরের দমন-পীড়নের পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সে সময় দেশ অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় আক্রান্ত ছিল। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও দুঃশাসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে, ব্যাংকিং খাত লুটপাট ও অর্থপাচারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার প্রতিও জনআস্থা কমে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের সুপারিশের পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে বাস্তবসম্মত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
প্রেস উইং জানায়, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৮ মাসে প্রায় ১৩০টি নতুন ও সংশোধিত আইন প্রণয়ন এবং ৬০০-র বেশি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
অর্থনীতি ও পররাষ্ট্র সম্পর্কেও অগ্রগতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জাপান–এর সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির ফলে প্রায় ৭ হাজার ৪০০টি বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে। চীন–এর সহযোগিতায় ঋণের মেয়াদ বাড়ানো, স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার অগ্রগতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–এর সঙ্গে আলোচনায় শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে তদারকি জোরদার, ৪২টি মন্ত্রণালয়ে ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো–কে তথ্য প্রকাশে স্বাধীনতা দেওয়ার কথাও জানানো হয়।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে সংস্কারের অংশ হিসেবে ১২০০-র বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন–কে পুনর্গঠন করে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ নাম দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মেধাভিত্তিক বিচারপতি নিয়োগ এবং নির্বাহী হস্তক্ষেপের অবসানের কথাও তুলে ধরা হয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার ও বন্ধ গণমাধ্যম পুনরায় চালুর মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরে এসেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
সবশেষে বিবৃতিতে বলা হয়, এসব সংস্কার নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের সূচনা মাত্র। ১৬ বছরের ক্ষতি ১৮ মাসে পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে দেশ দৃঢ়ভাবে স্বৈরাচারী আচরণ ও ব্যবস্থা থেকে সরে এসে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।