
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়—এই তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন : সংখ্যালঘু অধিকার, প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মত ব্যক্ত করেন।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) আয়োজিত ওই সেমিনারে অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, “৫৪ বছরের ইতিহাসে কেউ কথা রাখেনি।” তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও নিপীড়নের কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি এবং গণতন্ত্রের পরিবর্তে দেশে ‘মবোক্রেসি’ গড়ে উঠেছে।
আলোচনায় অংশ নেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ ও সভাপতি নির্মল রোজারিও, গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, ঢাকা মহানগর পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয়, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার, বাংলাদেশ দলিত পরিষদের বিভাগীয় প্রধান চন্দ্রমোহন রবিদাস, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সভাপতি ফাল্গুনী ত্রিপুরা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নিকোলাস চাকমা, প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ শংকর সাহা, সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলনের মুখ হো চি মিন ইসলাম, ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান এবং সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
শাহীন আনাম বলেন, “আমাদের সরকারের প্রতি যে আস্থা ভেঙে গেছে, তা আমরা গ্রহণ করতে চাই না। সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর এবং মানুষের জীবন পুড়ে ফেলা হয়েছে এবং তার বিচার নিয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই। যারা ভুক্তভোগী, তাদের কোনো বিশ্বাস নেই যে বিচার হবে।” তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, মুসলিম সমাজের মধ্যেও কিছু সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে এবং তাদের সমস্যাগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি জানান, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে, এমনকি শিশুদেরও লক্ষ্য করা হয়েছে। নির্বাচন সামনে থাকায় নির্বাচন কমিশনের নজরদারি ও হটলাইন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া বলেন, “আত্মপরিচয়ের সংকট আমরা এখনো সমাধান করতে পারিনি।” তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আদিবাসীদের স্বীকৃতি নিশ্চিত হয়নি এবং বিভক্তির কারণে সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রশ্নে ঐক্য গড়ে ওঠেনি।
জয়ন্ত কুমার দেব বলেন, রাষ্ট্র বারবার মানুষকে তাদের সংখ্যালঘু পরিচয় মনে করিয়ে দেয়, যার ফল হিসেবে তারা সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হয়। তিনি বলেন, অর্থবহ অংশগ্রহণ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়।
বিজন কান্তি সরকার বলেন, সংবিধানে অনেক সুরক্ষা থাকলেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ নেই। তিনি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনাকে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। সংসদে সংখ্যালঘুদের জন্য প্রায় ৬০টি আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব থাকলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়ে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাসুদেব ধর বলেন, “২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগামী নির্বাচনেও সংখ্যালঘুরা নিরাপদে ভোট দিতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত—এবং সেটি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।