
গাজায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও মানসিক আঘাতের পর নিজের চুল, ভ্রু এবং চোখের পাপড়ি হারিয়েছে ১২ বছর বয়সী সেনা রিদওয়ান। এখন চিকিৎসা নিয়ে আগের চেহারা ফিরে পেতে চায় সে। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলে নিজেকেই চিনতে পারে না এই কিশোরী। তার স্বপ্ন, আবার আগের মতো চুল আঁচড়ানো, স্কুলে ফেরা এবং অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক শৈশব কাটানো।
২০২৩ সালে শুরু হওয়া গাজায় ইসরায়েলের হামলা যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘ এই সংঘাত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে। বাড়িঘর হারানো, বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া, ক্ষুধা-তৃষ্ণা এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে মানসিক আঘাতের নানা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
খান ইউনিসের মাওয়াসি এলাকায় পরিবারের সঙ্গে একটি তাঁবুতে বসবাস করছে সেনা। চুল থাকা অবস্থায় তোলা পুরোনো ছবির দিকে তাকানোর পর আয়নায় নিজের চুলহীন মুখ দেখে সে। নিজের চেহারার এই পরিবর্তন মেনে নেওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
এক প্রতিবেদকের কাছে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সেনা জানায়, সংঘাতের সময় সে হারিয়েছে নিজের বাড়ি, বন্ধু এবং খেলনাও। হামলার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চুল পড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে মাথার সব চুল ঝরে যায়। একই সঙ্গে হারিয়ে যায় ভ্রু ও চোখের পাপড়িও।
সেনার ভাষ্য, চিকিৎসার জন্য যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো কোনো কাজে আসেনি। যেসব চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়েছিল, তাঁরাও চুল পড়ে যাওয়ার সঠিক কারণ শনাক্ত করতে পারেননি। গাজায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় তার সুস্থ হয়ে ওঠার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আয়নায় তাকালে নিজেকে চিনতে পারে না সেনা
সেনা বলেছে, “আমি (গাজা উপত্যকা থেকে) বেরিয়ে আসতে, চিকিৎসা নিতে, আমার চুলগুলো আগের মতো ফিরে পেতে এবং স্কুলে ফিরে যেতে চাই।”
নিজের বদলে যাওয়া চেহারা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে সে বলে, “আমার চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমাকে এখন আর আমার বন্ধুদের মতো দেখতে লাগে না।”

একসময় পড়াশোনায় ভালো ছিল সেনা। তার প্রাপ্ত জিপিএ ছিল ৯৯। কিন্তু চেহারার পরিবর্তনের কারণে সহপাঠীদের উপহাস ও উৎপীড়নের মুখে পড়ে এখন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সে। শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি এই পরিস্থিতি তার মানসিক অবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
সেনার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা, আবার নিজের চুল, ভ্রু ও চোখের পাপড়ি ফিরে পাওয়া। কৈশোরে এমন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হওয়ায় তার আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে সে জানায়, অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে চায়।

সেনার কথায়, “আমি অন্য বাচ্চাদের মতো চুল, ভ্রু এবং চোখের পাপড়ি পেতে চাই। আমি আমার শৈশব হারিয়ে ফেলেছি। আমার স্বপ্ন হলো চিকিৎসা করানো, অন্য বাচ্চাদের মতো শৈশব কাটানো, স্কুলে যাওয়া এবং আগের মতো একজন সফল শিক্ষার্থী হওয়া। আমি নিজের চুল আঁচড়াতে, চুলে ক্লিপ পরতে সক্ষম হতে চাই এবং হাঁটার সময় যেন কেউ আমাকে উপহাস না করে।”
মেয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সহায়তা চেয়েছেন সেনার বাবা মুহাম্মদ রিদওয়ান। তাঁর মতে, যুদ্ধের সময় ভয়াবহ আতঙ্ক ও বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতার কারণেই মেয়ের চুল ঝরে গেছে।
মুহাম্মদ রিদওয়ান জানান, সেনাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য তাঁরা একটি চিকিৎসা-রেফারেল পেয়েছেন। মেয়েকে সুস্থ করে আগের জীবনে ফিরিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
ইসরায়েলি হামলার পর বাড়ছে দাদ ও শ্বেতী রোগে
গাজায় ইসরায়েলি হামলার পর চুল পড়ে যাওয়া এবং ত্বকের রং ফিকে হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। নাসের হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগের প্রধান এসাদ সাদিক বলেন, যুদ্ধের কারণে চুল পড়ে যাওয়া এবং হাইপোপিগমেন্টেশন—ত্বকের রঞ্জকতা কমে যাওয়ার সমস্যা—বাড়ছে। ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে চুল ঝরে পড়ার ঘটনা এখন বেশ সাধারণ হয়ে উঠেছে।
এসাদ সাদিকের ভাষ্য, অ্যালোপেসিয়া অ্যারেটা এবং ভিটিলিগোর মতো রোগ শিশুদের শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যায় আক্রান্ত শিশুরা অনেক সময় সমবয়সীদের উপহাস ও উৎপীড়নের শিকার হয়।
তিনি বলেন, “অ্যালোপেসিয়া অ্যারেটা এবং ভিটিলিগো কিছু শিশুর মনস্তত্ত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা সমবয়সীদের দ্বারা উৎপীড়নের শিকার হয়। গাজায় এই রোগগুলোর চিকিৎসার সুযোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে এবং আক্রান্তের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়।”
যুদ্ধের কারণে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সংকট সেনার মতো শিশুদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। নিজের হারানো চেহারা ও শৈশব ফিরে পাওয়ার আশায় এখনো চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছে সেনা। তার চাওয়া খুব সাধারণ—আবার স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে মেশা এবং উপহাসের ভয় ছাড়াই স্বাভাবিক জীবন কাটানো।
সূত্র: আনাদুলু এজেন্সি