
অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থী থেকে বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার, লন্ডনের ঝলমলে জীবন থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ এবং শেষ পর্যন্ত কারাগার—ইমরান খানের জীবন যেন একের পর এক নাটকীয় বাঁক নেওয়া গল্প। তার জীবনের এই রূপান্তর অনেকটা সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।
পাকিস্তানের একটি অভিজাত পরিবারে জন্ম নেওয়া ইমরান খানের তারুণ্যের বড় একটি সময় কেটেছে ইংল্যান্ডে। ১৯৭৫ সালে অক্সফোর্ডের খ্যাতনামা কেবল কলেজ থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। এরপর লন্ডনের উচ্চবিত্ত ও আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে দ্রুতই নিজেকে মানিয়ে নেন।
লন্ডনের ঝলমলে জীবন ও প্লেবয় ইমেজ
লন্ডনের অভিজাত নাইটক্লাব, মডেল ও তারকাদের সঙ্গে ওঠাবসা—এসব কারণে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডের বিনোদন পাতায় নিয়মিত জায়গা করে নিতেন ইমরান খান।
রক্ষণশীল পাকিস্তানি সমাজ থেকে উঠে আসা এই তরুণের পশ্চিমা ধাঁচের চাকচিক্যময় জীবনযাপন তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলাদা পরিচিতি দেয়। ধীরে ধীরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় সেলিব্রিটি প্লেবয়ের একটি ইমেজ।
তবে তার পরিচয়ের সবচেয়ে বড় জায়গাটি ছিল ক্রিকেট।
ক্রিকেট মাঠে অধিনায়ক হিসেবে উত্থান
ক্রিকেটের পিচে ইমরান খান ছিলেন অসাধারণ এক খেলোয়াড় ও অধিনায়ক। প্রায় দুই দশক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দাপটের সঙ্গে খেলার পর ১৯৯২ সালে তার নেতৃত্বেই পাকিস্তান বিশ্বকাপের কাঙ্ক্ষিত শিরোপা জয় করে।
বিশ্বকাপ জয়ের পর ক্রিকেটকে বিদায় জানান ইমরান। এর পরপরই তার ব্যক্তিগত জীবনেও আসে বড় ধরনের পরিবর্তন।
১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ ধনকুবেরের মেয়ে জেমিমা গোল্ডস্মিথকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের সেই দাম্পত্য জীবন অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০০৪ সালে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে।
প্লেবয় জীবন থেকে আধ্যাত্মিকতা
বিচ্ছেদের পর ইমরান খানের জীবনধারায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। জীবন সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনায় দেখা দেয় বৈরাগ্যের প্রভাব এবং তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকতে থাকেন।
পরবর্তীতে আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বুশরা বিবিকে বিয়ে করেন ইমরান। এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তার জীবনযাত্রায় আরও বড় পরিবর্তন আসে।
তার নতুন এই জীবনধারা ছিল তার যৌবনের সেই পশ্চিমা জীবনযাপন ও প্লেবয় ইমেজের সম্পূর্ণ বিপরীত।
ক্রিকেট থেকে রাজনীতির ময়দানে
১৯৯৬ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ইমরান খান। ওই বছরই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ’ (পিটিআই)।
রাজনীতিতে প্রবেশের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে তাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। প্রায় দেড় দশকের রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ২০১৮ সালে তরুণদের সমর্থন নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি।
একসময় লন্ডনের নাইটক্লাব ও আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত ইমরান রাজনীতিতে এসে কট্টর ইসলামপন্থী ও জনবান্ধব বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তার এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছেও বেশ চমকপ্রদ হিসেবে দেখা দেয়।
প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে কারাগারে
তবে পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেননি ইমরান খান।
বিভিন্ন রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর পর তাকে কারাগারে যেতে হয়।
ফলে তার জীবনের পরিচয়ও একের পর এক বদলেছে—অক্সফোর্ডের তরুণ শিক্ষার্থী, লন্ডনের অভিজাত জীবনযাপনে অভ্যস্ত সেলিব্রিটি, বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেট অধিনায়ক, আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে পড়া ব্যক্তি, এরপর রাজনীতির মাঠের জনপ্রিয় নেতা এবং শেষ পর্যন্ত কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
এই দীর্ঘ ও নাটকীয় যাত্রায় ইমরান খানের রূপান্তর পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক বিরল এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে উঠে এসেছে।