
ব্রিকসের ১১ সদস্যের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এবারের সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পৃথক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংও দুই দিনের এই সম্মেলনে অংশ নেবেন।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তির প্রকাশ করা ভিডিওতে পুতিনকে দিল্লির পালাম বিমানঘাঁটিতে নামতে দেখা গেছে। সেখানে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং তাকে স্বাগত জানান।
শি চিনপিংয়ের এবারের ভারত সফরও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম তিনি ভারত সফর করছেন। ওই সময় হিমালয়ের বিতর্কিত সীমান্তে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য ভারত-চীন সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে বিমান চলাচল, ভিসা ব্যবস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ পুনরায় চালু হচ্ছে। তবে সীমান্ত বিরোধ পুরোপুরি মেটেনি। পারস্পরিক অবিশ্বাস, ভারতের সঙ্গে চীনের বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি এবং এশিয়ায় দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখনো সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে।
ব্রিকস সম্মেলন সামনে রেখে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। মধ্য দিল্লির বেশ কয়েকটি এলাকায় যান চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ বাসিন্দাদের ধৈর্য ধরার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করা ব্রিকস পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরও কয়েকটি দেশ জোটটির সদস্য। তবে সম্প্রসারণের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে সদস্য দেশগুলোর মতপার্থক্যও বেড়েছে।
ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক হর্ষ ভি পান্তের মতে, এবারের সম্মেলনে উপসাগরীয় সংঘাত সবচেয়ে বড় মতবিরোধের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, ব্রিকসের সম্প্রসারণ একসময় জোটটির সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও এখন সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেজেশকিয়ানের এটিই প্রথম ভারত সফর। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবারের আলোচনায় আরও গুরুত্ব পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের শিলান শাহ বলেন, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ব্রিকসের সম্প্রসারিত সদস্যদের মধ্যে ঐক্যের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
গত মে মাসে দিল্লিতে বৈঠক করেও ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেননি। এতে জোটটির ভেতরে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
ইরান ও ইসরায়েল—দুই দেশের সঙ্গেই ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে নয়াদিল্লি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে ভারতকে সতর্কভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় ভারত রাশিয়ার ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার এবং ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পর মস্কো ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ জ্বালানি সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনাও রয়েছে।
পুতিন এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারত সফর করেছিলেন। চলতি মাসেই কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির বৈঠক হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি ইউক্রেন সফর করেছেন। সফরের সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ বন্ধে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
সব মিলিয়ে এবারের ব্রিকস সম্মেলন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেই নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।