
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যেই এবার দ্বীপগুলোর আশপাশে তেল উত্তোলনে যুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং ফকল্যান্ড ঘিরে তেল প্রকল্প বন্ধে নতুন আইন করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে মিলেই বলেন, ফকল্যান্ডের কাছে তেল ও গ্যাস উত্তোলনে জড়িত কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হবে। আর্জেন্টিনা যেটিকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে, কিন্তু বর্তমানে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে থাকা ওই এলাকায় আর্জেন্টিনার অনুমতি ছাড়া পরিচালিত প্রকল্পকে তিনি দেশটির সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন।
বিদ্যমান আইনের আওতায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে একটি ডিক্রি জারি করার কথাও জানান মিলেই। শুধু তেল প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত প্রতিষ্ঠান নয়, তাদের অংশীদার, পরিচালক ও সরবরাহকারীদেরও শাস্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
এর পাশাপাশি আর্জেন্টিনার কংগ্রেসে জরুরি ‘ন্যাশনাল সার্বভৌমত্ব প্রতিরক্ষা’ বিল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন মিলেই। প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে ফকল্যান্ডের আশপাশে আর্জেন্টিনার অনুমতি ছাড়া পরিচালিত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানি ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ তৈরি হবে।
মিলেইয়ের ঘোষণার মূল লক্ষ্যগুলোর একটি ‘সি লায়ন’ তেল প্রকল্প। ফকল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় অববাহিকায় সমুদ্রের তলদেশে থাকা এই তেলক্ষেত্রটি পরিচালনা করছে যুক্তরাজ্যের রকহপার এক্সপ্লোরেশন ও ইসরায়েলের নাভিতাস পেট্রোলিয়াম। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রকল্পটির উন্নয়নকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটির।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সি লায়ন তেলক্ষেত্রে আনুমানিক ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন বা ১৭০ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে। এটি ফকল্যান্ডের উপকূল থেকে প্রায় ১৩০ মাইল দূরে অবস্থিত। তুলনায়, উত্তর সাগরে শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের পশ্চিমে অবস্থিত রোজব্যাংক তেলক্ষেত্রে আনুমানিক ৩০০ মিলিয়ন বা ৩০ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে।
মিলেই বলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সি লায়ন প্রকল্পে তেল উন্নয়ন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আর্জেন্টিনার স্বার্থের জন্য জরুরি হুমকি তৈরি করেছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ফকল্যান্ডের আশপাশের সমুদ্র থেকে আর্জেন্টিনার তেল উত্তোলনের বাস্তব সক্ষমতা তৈরি হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আর্জেন্টিনায় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে ‘লাস মালভিনাস’ নামে ডাকা হয়। দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ১৮৩৩ সাল থেকে দ্বীপপুঞ্জটি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৯৮২ সালে এ বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়।
ওই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সামরিক সদস্য, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সামরিক সদস্য এবং তিনজন দ্বীপবাসী নিহত হন।
যুক্তরাজ্য এখনো ফকল্যান্ডের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের অবস্থান বজায় রেখেছে। ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য, দ্বীপবাসীদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। তারা যতদিন ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকতে চাইবে, ততদিন ফকল্যান্ড ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবেই থাকবে।
২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটেও ফকল্যান্ডের বাসিন্দারা ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকার পক্ষে বিপুল সমর্থন দেন। ওই ভোটে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে মত দেন।
ফকল্যান্ডের প্রশ্নে মিলেইয়ের বর্তমান অবস্থান আগের তুলনায় কঠোর বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে তিনি দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এবার তেল প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সরাসরি কোম্পানি, তাদের অংশীদার ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছেন।
একই ভাষণে আর্জেন্টিনার দক্ষিণাঞ্চলীয় তিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রদেশে নৌঘাঁটি নির্মাণে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি ওই অঞ্চলের যোগাযোগ ও টেলিযোগাযোগ সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
ফকল্যান্ড ইস্যুতে মিলেইয়ের নতুন অবস্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প বলেছেন, ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থান পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম জিবি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফকল্যান্ড নিয়ে সম্ভাব্য সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যকে সহায়তা করবে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা না করার অভিযোগ তোলেন।
মিলেই তার ভাষণে দাবি করেন, ফকল্যান্ড প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা আর্জেন্টিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বিশ্বে এমন কিছু পরিবর্তনের ‘হাওয়া’ বইছে, যা আর্জেন্টিনার দাবির পক্ষে যাচ্ছে।
ফকল্যান্ড ইস্যুতে মিলেইয়ের কঠোর অবস্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনাও রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। আগামী বছর আর্জেন্টিনায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা।
দেশটিতে ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের দাবি জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে তেল উত্তোলনের মতো একটি বাস্তব ও অর্থনৈতিক ইস্যুকে সামনে রেখে মিলেইয়ের কঠোর অবস্থান তাকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতেও সহায়তা করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।